সংবাদপত্রের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে প্রতিদিন এত মৃত্যু, এত বেদনা, এত আর্তনাদ জমা হয় যে ধীরে ধীরে মানুষ যেন কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে। আমরা খবর দেখি, কিছুক্ষণ আলোচনা করি, তারপর আবার নিজের ব্যস্ততায় ডুবে যাই। কিন্তু কিছু কিছু সংবাদ থাকে, যা কেবল চোখে পড়ে না- সোজা গিয়ে আঘাত করে বিবেকে।
কিছু ঘটনা আছে, যা পড়ে শেষ করার পরও দীর্ঘ সময় বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভার জমে থাকে। মিরপুরের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে ৭২ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। এটি শুধু একজন বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর গল্প নয়; এটি আমাদের সময়ের নৈতিক দুর্ভিক্ষ ও নির্মম মানবিক সংকটের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।
একজন মা। যিনি হয়তো সারাজীবন সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, জ্বরের রাতে কপালে পানি দিয়েছেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই মা মৃত্যুর পর সাত-আট দিন ধরে বিছানায় পড়ে রইলেন। শরীর পঁচে মাংস খুলে বিছানায় পড়ে গেল। অথচ একই বাসায় থাকা মেয়ে টের পেলেন না। আর দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ছেলেরা কেউ মায়ের পাশে ছিলেন না।
এখানে আরেকটি গভীর উদ্বেগের এবং হৃদয় বিদারক প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। নুরজাহান বেগম কোনো পথের মানুষ ছিলেন না, কোনো পরিত্যক্ত বৃদ্ধাশ্রমেও ছিলেন না। তিনি বসবাস করছিলেন রাজধানীর একটি বহুতল আবাসিক ভবনে- মানুষে ঘেরা, সভ্যতার আলোয় মোড়া এক নগরজীবনের মধ্যে। অথচ সেই সুরম্য অট্টালিকার ভেতরেই তিনি পড়ে ছিলেন একটি জীর্ণ, অগোছালো, আবর্জনায় ভরা ছোট্ট কক্ষে, যেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি নিজের ঘরেই পরবাসী হয়ে গিয়েছিলেন।
আরও বেদনাদায়ক সত্য হলো- আমরা ঠিক এর মধ্যেই ঈদ উদযাপন করেছি। ২৮ মে মানুষ নতুন পোশাক পরেছে, পরিবার নিয়ে ছবি তুলেছে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দের হাসি ছড়িয়ে দিয়েছে। অথচ যদি সত্যিই নুরজাহান বেগম সাত-আট দিন আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায়- ঈদের দিনও সন্তানেরা মায়ের খোঁজ নেয়নি। ভাবা যায়?
যে মা হয়তো একসময় ঈদের সকালে সন্তানদের নতুন কাপড় গুছিয়ে রাখতেন, সেমাই রান্না করতেন, সন্তানের হাসিমুখ দেখার জন্য নিজের সব ক্লান্তি ভুলে যেতেন- সেই মা ঈদের দিন নিঃসঙ্গ পড়ে রইলেন, আর তার অনুপস্থিতিও কেউ টের পেল না।
এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে নির্মম নৈতিক বিপর্যয়গুলোর একটি। কারণ কোনো সমাজ তখনই ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, যখন উৎসবের আনন্দও মানুষকে তার মা-বাবার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে না।
এই ঘটনাটি শুধু পারিবারিক অবহেলার অভিযোগ নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের আত্মিক মৃত্যুর ঘোষণা।
বাংলাদেশ একসময় পারিবারিক বন্ধনের জন্য বিশ্বে পরিচিত ছিল। যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সংস্কৃতির শক্ত ভিত্তি। বৃদ্ধ মা-বাবা ছিলেন পরিবারের আশীর্বাদ। গ্রামের উঠোনে কিংবা শহরের পুরানো বাড়িতে দাদা-দাদি, নানা-নানিদের উপস্থিতি ছিল এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা। কিন্তু আধুনিকতার নামে আমরা ধীরে ধীরে এমন এক নগর সভ্যতা নির্মাণ করেছি, যেখানে মানুষ যত শিক্ষিত হচ্ছে, তত একা হয়ে পড়ছে; যত ধনী হচ্ছে, তত সম্পর্কহীন হয়ে যাচ্ছে। নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আসলে সেই একাকীত্বের পঁচন ধরা প্রতীক।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, তার এক ছেলে মোংলা স্থলবন্দরের সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। অর্থাৎ সমাজের চোখে তারা প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত, সফল মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে সন্তান মায়ের মৃত্যুর খবর কয়েকদিন পর্যন্ত রাখে না, সে কি সত্যিই সফল? রাষ্ট্রের বড় পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ চাকরি, উচ্চশিক্ষা কিংবা সামাজিক অবস্থান- এসব কি একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানাতে পারে, যদি তার হৃদয়ে মায়ের জন্য ন্যূনতম দায়িত্ববোধ না থাকে?
আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে সাফল্যের সংজ্ঞা কেবল অর্থ, পদ-পদবি আর ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অথচ মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ- এসব যেন ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। আজকাল সন্তানদের বড় করা হয় প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য, কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার সময় যেন কারও নেই।
এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, একই বাসায় থেকেও মা-মেয়ের মধ্যে এমন বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল যে মৃত্যুর গন্ধও সম্পর্কের দূরত্ব ভাঙতে পারেনি। এটি কেবল মানসিক অসুস্থতার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ব্যর্থতারও প্রশ্ন। নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট সবকিছু মিলে আমরা এমন এক অমানবিক বাস্তবতায় পৌঁছেছি, যেখানে মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও পরস্পরের কাছে অপরিচিত।
এখানে রাষ্ট্রেরও দায় আছে। বাংলাদেশে বৃদ্ধদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কিংবা একাকী প্রবীণদের পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে নির্দিষ্ট বয়সের পর একা বসবাসকারী প্রবীণদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হয়। সামাজিককর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা স্থানীয় প্রশাসন তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু আমাদের দেশে বৃদ্ধরা যেন পরিবারের করুণার ওপর নির্ভরশীল এক অবাঞ্ছিত জনগোষ্ঠী।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা ধর্মপ্রাণ সমাজ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে ভালোবাসি। মসজিদে মসজিদে মা-বাবার মর্যাদা নিয়ে ওয়াজ হয়, ধর্মীয় বয়ানে জান্নাতকে মায়ের পায়ের নিচে বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে কত মা-বাবা আজ অবহেলায়, নিঃসঙ্গতায়, অপমানে দিন কাটাচ্ছেন? ধর্মীয় আবেগ আর সামাজিক বাস্তবতার এই ভয়ংকর বৈপরীত্য আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দ্বিচারিতা যেন ক্রমেই আমাদের সমাজের অলংকার হয়ে উঠছে।
তবে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জনরোষের মধ্যেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষোভ থেকে অনেকে কঠোর শাস্তির কথা বলছেন, “জনতার আদালত”-এর কথা বলছেন। কিন্তু সভ্য রাষ্ট্রে বিচার আবেগ দিয়ে নয়, আইন দিয়েই হতে হয়। যদি প্রমাণিত হয় যে সন্তানরা ইচ্ছাকৃত ভাবে দায়িত্বহীনতা, অবহেলা বা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে মাকে এমন অবস্থায় ফেলে রেখেছিলেন, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বাংলাদেশে “পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন” রয়েছে। সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, আইন দিয়েও কি সব সমস্যার সমাধান সম্ভব? একজন সন্তানকে জোর করে মায়ের প্রতি ভালোবাসা শেখানো যায় না। আদালত শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু মমত্ববোধ তৈরি করতে পারে না। এই সংকটের মূল আমাদের পরিবার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে।
আমরা সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, অধ্যাপক বানাতে চাই; কিন্তু মানুষ বানাতে চাই না। আমরা তাদের বিদেশে পড়তে পাঠাই, বড় চাকরি পেতে উৎসাহ দিই, কিন্তু বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক শিক্ষা দিই না। ফলে একসময় সন্তানরা সব পায়, শুধু হৃদয়টা হারিয়ে ফেলে। আজকের শহুরে জীবনে আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা হলো মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। নুরজাহান বেগমের মেয়েকে পুলিশ “অস্বাভাবিক” মনে করেছে। এটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ বিষণ্নতা, একাকীত্ব, মানসিক বিপর্যয় কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছেন, কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছেন না। মানসিক অসুস্থতাকে এখনও আমরা লজ্জা কিংবা পাগলামি হিসেবে দেখি। ফলে অসংখ্য পরিবার নীরবে ভেঙে যাচ্ছে। এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সময়ের এক সামাজিক মহামারীর প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হলো- আমরা কোথায় যাচ্ছি?
যে সমাজে বৃদ্ধ মা মৃত্যুর পর সপ্তাহজুড়ে পঁচে পড়ে থাকেন, যে সমাজে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষও কিছু বুঝতে পারেন না, যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা মায়ের খোঁজ রাখেন না- সেই সমাজ কি সত্যিই উন্নত হতে পারে? মেট্রোরেল, উড়াল সেতু, স্মার্ট সিটি- এসব উন্নয়ন কি কোনো অর্থ বহন করে, যদি মানুষের ভেতরের মানবিকতা ধ্বংস হয়ে যায়?
নুরজাহান বেগমের পঁচন ধরা মরদেহ আসলে আমাদের collective conscience-এর পঁচনের প্রতীক। এটি সেই দুর্গন্ধ, যা শুধু একটি ঘর থেকে নয়, পুরো সমাজের বিবেক থেকে বের হচ্ছে। এখন প্রয়োজন জাতীয় ভাবে প্রবীণদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মিডিয়ায় পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে একাকী প্রবীণদের তালিকা তৈরি করে নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানদেরও বুঝতে হবে- মা ও বাবা কোনো বোঝা নন; তারা আমাদের অস্তিত্বের শিকড়।
কারণ একজন বৃদ্ধ মা-বাবার সবচেয়ে বড় চাওয়া অর্থ, সম্পদ বা বিলাসিতা নয়; তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া সন্তানের একটু সময়, একটু মমতা, একটু খোঁজ নেওয়া। জীবনের শেষ বয়সে তারা আসলে পৃথিবীর সব সুখ ভুলে গিয়ে শুধু আপন মানুষের সান্নিধ্য খোঁজেন। অথচ আমরা আধুনিকতার দৌঁড়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে সেই মানুষগুলোর নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাসও আর শুনতে পাই না।
একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের অসুস্থ হয়ে পড়ে, যখন সেখানে বৃদ্ধ মা-বাবারা নিজ ঘরেই পরবাসী হয়ে যান। যখন সন্তানের ব্যস্ততার কাছে মায়ের কান্না তুচ্ছ হয়ে যায়। যখন সম্পর্কের চেয়ে পদ-পদবি বড় হয়ে ওঠে। তখন বুঝতে হবে, সংকট শুধু একটি পরিবারের নয়- সংকট পুরো সমাজের।
আমি মনে করি, সময় এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। এখনো হয়তো আমরা ফিরে যেতে পারি পরিবারের
কাছে, সম্পর্কের কাছে, মায়ের স্নেহমাখা ডাকে, বাবার নিঃশব্দ অপেক্ষার কাছে। কারণ মানবিকতা
হারিয়ে গেলে কোনো সভ্যতাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না।
পৃথিবীর সব অর্জনের চেয়েও বড় সত্য একটাই- শেষ পর্যন্ত মানুষ বেঁচে থাকে মানুষের ভালোবাসায়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
এমএ