"শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড"। কিন্তু আজ যখন চারপাশে তাকাই, তখন মনে প্রশ্ন জাগে, একটি জাতির মেরুদণ্ড আসলে কেমন হওয়া উচিত? তা কি শামুকের মতো নরম ও ভঙ্গুর, নাকি সেগুন বৃক্ষের মতো দৃঢ় ও মজবুত? কেমন মেরুদণ্ড চাই আমাদের আগামীর প্রজন্মের জন্য? আর সেই শক্ত মেরুদণ্ড গড়ে তোলার উপায়টাই বা কী?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত বিজ্ঞজনেরা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে গভীর চিন্তা করেন। তবে সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে তিনটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় সামনে আনতে চাই:
১. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ইতিহাস বলে, এক সময় জ্ঞান অর্জন ছিল অত্যন্ত দুরূহ সাধনা। শিক্ষার্থীদের মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে কোনো বিদগ্ধ গুরুর সান্নিধ্যে গিয়ে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। সভ্যতার বিবর্তনে পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। লাইব্রেরির বইয়ের পাতায় শিক্ষার্থীদের দিনের পর দিন ডুবে থাকা—এভাবেই চলল প্রায় ১০০ বছর। কিন্তু আজ আমরা এখন বাস করছি তথ্যের মহাসমুদ্রের যুগে। যেকোনো স্থানে বসেই মহাবিশ্বের যেকোনো জ্ঞান আজ মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রযুক্তি এই প্রক্রিয়াকে এতটাই গতিশীল করেছে যে, যে জ্ঞান অর্জনে অতীতে বছরের পর বছর লেগে যেত, আজ তা মাত্র কয়েক দিনেই নিজের আয়ত্তে আনা সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপট আমাদের এক বড় জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়—জ্ঞান বিতরণের মাধ্যম হিসেবে প্রথাগত স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি আগামী দিনে তাদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারবে? নাকি এই রূপান্তরিত বাস্তবতায় শিক্ষাদানের সনাতন পদ্ধতিকে আমূল পুনর্গঠন করার সময় এখনই?
২. সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতার আকাল
বেঁচে থাকার জন্য যেমন অক্সিজেন অপরিহার্য, তেমনি সুন্দর জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান হলো ‘সামাজিক দক্ষতা’। একসময় আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা বা সংকট ব্যবস্থাপনার মতো জীবনমুখী দক্ষতাগুলো মানুষ পরিবার ও সমাজ থেকে অবলীলায় শিখে যেত স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু আজ আমরা এক অদ্ভুত সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি। নগর জীবন আর একক পরিবারের চার দেওয়ালে বন্দি হয়ে আমাদের শিশুরা ভীষণ একা হয়ে বড় হচ্ছে। তাদের মাঝে এই অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক ও আবেগীয় গুণগুলো আর স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারছে না। তাই এখনই ভাবার সময়, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশকে কীভাবে আবেগীয় ও সামাজিক দক্ষতা মজবুত করার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
৩. জিপিএ-৫ বনাম প্রকৃত দক্ষতা
আমরা আসলে আমাদের সন্তানদের থেকে কী চাই? তারা জিপিএ-৫-এর গোল্ডেন হরিণ আর সর্বোচ্চ ডিগ্রির স্তূপীকৃত সার্টিফিকেট বগলে নিয়ে বেকারত্বের বাজারে ঘুরে বেড়াবে? নাকি তারা কোনো একটি নির্দিষ্ট পেশায় নিজেকে এমন দক্ষ করে তুলবে, যাতে বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারে? যদি আমরা চাই আমাদের সন্তানেরা সার্টিফিকেট নয়, বরং 'দক্ষতা' দিয়ে জগত জয় করুক, তবে কি শৈশব থেকেই তাদের মনে সেই স্বপ্নের বীজ বুনে দেওয়ার সময় নয়?
১৯৭৫ সালের দিকের কথা। হাঙ্গেরির এক দূরদর্শী শিক্ষক ছিলেন লাজলো পোলগার; গবেষণা শুরু করেছিলেন, ‘শিশুদের অন্তরে স্বপ্নের বীজ বপন পদ্ধতি’ নিয়ে। এই জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন নিজের তিন কন্যা—সুসান, সোফিয়া আর জুডিকে। বাবা ও মা মিলে শুরু করেন তিন কন্যার জীবনে স্বপ্নের বীজ বপন ও তার নিবিড় পরিচর্যার কাজ।
পোলগার দাবা খেলায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি মনস্থির করলেন, নিজের মেয়েদের দাবার দুনিয়ায় বিস্ময় হিসেবে গড়ে তুলবেন। পুরো বাড়িটিকে তিনি রূপান্তর করলেন দাবার এক জাদুকরী রাজ্যে। ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো বিশ্বসেরা দাবাড়ুদের ছবি, মেডেল আর তাদের অর্জনের গল্প। চারপাশের পরিবেশটাই এমন করা হলো, যেন মেয়েদের প্রতিদিনের চিন্তা, আনন্দ আর আড্ডার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দাবা।
বাবা-মা জানতেন, মানসিক অভ্যাসই জীবনসত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তারা কন্যাদের এমনভাবে দাবার জগতে অভ্যস্ত করলেন যে, বাচ্চারা এই খেলাটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করল। এক গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে বাবা সোফিয়াকে বিছানায় খুঁজে পেলেন না। খুঁজতে খুঁজতে বাথরুমে গিয়ে দেখলেন, ছোট্ট সোফিয়া একাকী বাথরুমের মেঝেতে দাবার ঘুঁটিগুলো নিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে আছে! বাবা পরম মমতায় বললেন, "সোফিয়া, অনেক রাত হয়েছে, এবার ওদের রেখে ঘুমাতে এসো।" সোফিয়া চোখের পলক না ফেলে উত্তর দিল, "বাবা, আমি ওদের ছেড়ে আসতে চাইলেও ওরা যে আমাকে ছাড়ছে না!"
তাদের এই প্রচেষ্টার ফল কী হয়েছিল জানেন?
বড় মেয়ে সুসান মাত্র ৪ বছর বয়সে দাবা খেলা শুরু করে এবং মাত্র ৬ মাসের মাথায় বড় বড় প্রাপ্তবয়স্ক খেলোয়াড়দের হারাতে শুরু করে। সোফিয়া যখন শুরু করে, তখন তার বয়স ছিল মাত্র আড়াই বছর। আর মাত্র ১৪ বছর বয়সে সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে! সবার ছোট জুডি পোলগার একেবারে শিশু অবস্থা থেকেই দাবার পরিবেশ পেয়েছিল। মাত্র ৫ বছর বয়সেই সে তার বাবাকে ছাড়িয়ে যায়। ১২ বছর বয়সে জুডি বিশ্বের সর্বকালের সেরা ১০০ দাবাড়ুর তালিকায় নিজের নাম লেখায়। আর ১৫ বছর ৪ মাস বয়সে সে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ 'গ্র্যান্ডমাস্টার' হওয়ার খেতাব অর্জন করে, যা দীর্ঘ ২৭ বছর এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেনি।
নিজেকে প্রশ্ন, আমরা কি এমন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করছি, যা দিয়ে শৈশবেই আমাদের শিশুদের অন্তরে একটি মহান জীবনলক্ষ্য জুড়ে দেওয়া যায় এবং সেই লক্ষ্যের প্রতি তাদের শ্রম আর সময় নিবেদন করা যায়?
কয়েক দিন আগে এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলছিলেন, তার ছোট্ট ছেলেটি পড়াশোনায় ভীষণ মেধাবী, সব বিষয়েই প্রায় একশোতে একশো পায়। কিন্তু সকালে যখন পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে সে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, ব্যাগের সেই নির্মম ওজনে শিশুটি সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারে না। শৈশবের যে চঞ্চলতা, তা ওই ব্যাগের নিচেই চাপা পড়ে গেছে; স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সাথে একটুখানি দৌড়াদৌড়ি করে খেলার সুযোগও তার ভাগ্যে জোটেনি।
আমার ভাগ্নী, দশম শ্রেণির ছাত্রী, তার লক্ষ্য সে একজন সফল ব্যবসায়ী হবে। অথচ গতকাল দেখলাম, সে মুখস্থ করছে মানবদেহের হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের কার্যপদ্ধতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই জ্ঞানটি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার জীবনের লক্ষ্যের সাথে এর সংযোগ কতটুকু? যদি তার এই শ্রম ও সময় নিজের লক্ষ্যের পেছনে ব্যয় হতো, তবে কি তা আরও অর্থবহ হতো না?
আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সিংহভাগ শিক্ষার্থীই নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে জীবনের সোনালি ৫-৭টি বছর কাটাতে হয় এমন সব বিষয় পড়ে, যার সাথে তাদের মনের কোনো সংযোগ নেই। যেখানে মনের টান নেই, সেখানে আন্তরিকতা আসে না, আসে না কোনো সৃজনশীলতা। শিক্ষা জীবন শেষ করে যখন তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন সেখানেও পছন্দের কাজের অভাব। ফলশ্রুতিতে, ৬৫ বা ৭০ বছর বয়সে পৌঁছে জীবনের শেষলগ্নে এসে এক তীব্র অপূর্ণতা আর মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার নিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়।
একবার গভীরভাবে ভেবে দেখুন, আমরা যদি শৈশবেই প্রতিটি শিশুর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে দিতে পারি এবং সেই লক্ষ্য ছোঁয়ার মতো একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে দিই, তবে কেমন হবে এই প্রজন্ম! এই জাতি কোন উচ্চতায় আসীন হবে! আর সেই মানুষগুলো তাদের কাজ ও জীবনকে কতটা উপভোগ করবে!
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)