কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে অনেকেরই একটি সাধারণ ধারণা এই যে, তিনি যেহেতু জমিদার ছিলেন, সেহেতু তাঁর ছিল অগাধ প্রাচুর্য আর ঐশ্বর্য। জীবন ছিল বিত্ত আর বৈভবে পরিপূর্ণ। সে কারণেই তাঁর জীবনে নিরবিচ্ছিন্ন সুখ ছিল, শান্তি ছিল। কিন্তু তাঁর বুকের মধ্যে যে কত বড় কষ্টের পাহাড় দানা বেঁধে উঠেছিল, মহীরুহের মতো তিনি যে কত ব্যথা-বেদনার তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, তাঁর সেই হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কাহিনী অনেকেই হয়তো জানেন না। কবিগুরুর সেই কষ্টবোধ তাঁর দার্শনিক সত্তাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছিল।
মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু সেই মায়ের স্থান দখল করেছিলেন তাঁর প্রিয় বৌদি কাদম্বরী দেবী। কবিগুরুর প্রথম জীবনের সাহিত্যসাধনায় কাদম্বরী দেবীর অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ বাংলা সাহিত্যকে করেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাত্র বাইশ বছর বয়সে মাতৃসম প্রিয় বৌদি আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর প্রথম আঘাত তাঁকে বিহ্বল-ব্যাকুল করে তোলে।
পরের আঘাত পেলেন তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স যখন ৪০ বছর, তখন তাঁর স্ত্রী তিন কন্যা এবং দুই পুত্র রেখে মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর বড় মেয়ে মাধুরীলতার বিয়ের বয়স দুই বছর। মাধুরীলতা ছাড়া অন্যান্য চার সন্তানের দায়িত্ব এসে পড়ল কবিগুরুর উপর। তিনি একাকী সেই দায়িত্ব বুঝে নিলেন নিজের কাঁধে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর আর কোনো দার গ্রহণ করলেন না কবি।
স্ত্রীর মৃত্যুর শোক ভুলতে না ভুলতেই দ্বিতীয় মেয়ে রেণুকা দেবী মাত্র বারো বছর বয়সে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হলো। কবিগুরু তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করলেন। কিন্তু সবই ব্যর্থ হলো। সকলকে ফাঁকি দিয়ে রেণুকা চলে গেলেন পরপারে। কবিগুরুর বুকে আবারও এক বিষাক্ত তীর বিদ্ধ হলো। এই আঘাতের শোক শেষ না হতেই কবির প্রিয়তম কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র তেরো বছর বয়সে কলেরায় মৃত্যুবরণ করে। শমীন্দ্রের অকালমৃত্যুতে কবি আবারও মর্মাহত হয়ে পড়েন। এর প্রায় দশ বছর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান মাধুরীলতা দেবী আক্রান্ত হলেন ক্ষয়রোগে। এমনিতেই শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না মাধুরীলতার, তার উপর ক্ষয়রোগ কবিকে অসহায় করে তুলল। কোনো প্রচেষ্টাতেই মাধুরীলতাকে বাঁচানো গেল না। তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
দুই কন্যা এবং এক পুত্রের মৃত্যুর পর বেঁচে রইলেন এক পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং এক কন্যা মীরা দেবী। মীরা দেবীর ছিল দুই সন্তান—পুত্র নীতীন্দ্রনাথ এবং কন্যা নন্দিতা। নাতি নীতুকে বৃদ্ধ কবি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনিই নীতীন্দ্রনাথকে ইউরোপে পাঠিয়েছিলেন লেখাপড়ার জন্য। কিন্তু আদরের সেই নাতিও মাত্র বিশ বছর বয়সে ক্ষয়রোগে মারা গেলেন। কবিগুরুর বয়স তখন একাত্তর বছর। তাঁর জীবিত অবস্থায় কন্যা মীরাকে পুত্রহারা দেখে শোকে পাথর হয়ে পড়লেন কবি। এভাবে একের পর এক মৃত্যু কবিগুরুর মনে এমনভাবে রেখাপাত করে যে, মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর এক দার্শনিক নির্লিপ্ততা সৃষ্টি হয়। জীবনের সঙ্গে মৃত্যুকেও মেনে নিয়েছিলেন স্বাভাবিক নিয়মরূপে।
শুধু মৃত্যুই নয়—সংসারের আরো কিছু যন্ত্রণা এবং কষ্ট কবিকে সর্বদাই বিদ্ধ করেছে। প্রিয়কন্যা মীরাকে বিয়ে দিয়েছিলেন নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়র সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই বিয়ের প্রধান উদ্যোক্তা। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ ছিলেন নির্মম প্রকৃতির মানুষ। যার ফলে মীরা দেবীর সংসার অশান্তিতে ভরে ওঠে। মেয়ের জীবনের এই অশান্তি কবিকে জর্জরিত করেছে। সেই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা কবির একটি চিঠিতে। চিঠিতে কবি লিখেছেন—‘‘মাঝে নগেন খুব রাগ করে একখানা চিঠি লিখেছিল। সে চিঠি আমি মীরাকে দেখতে পাঠিয়েছিলাম। আজ মীরা এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি তাকে কী উপদেশ দিই। নগেনের কাছে তাকে কি যেতেই হবে? অর্থাৎ আমি বললেই সে যেতে প্রস্তুত হবে। কিন্তু এতবড় নিষ্ঠুর দণ্ড আমি কি মীরাকে দিতে পারি? এর জীবনের প্রথম দণ্ড আমিই দিয়েছি। তাকে ভালো করে না ভেবে, না বুঝে আমিই ওর বিয়ে দিয়েছি। যখন দিচ্ছিলাম তখন মনে খুব একটা উদ্বেগ এসেছিল। বিয়ের রাতে মীরা যখন নাবার ঘরে ঢুকেছিল, তখন একটা গোখরো সাপ ফস করে ফণা তুলে উঠেছিল। আজ আমার মনে হয়, সে সাপ যদি তখনই ওকে কাটত তাহলেও ও পরিত্রাণ পেত। নগেনের মধ্যে একটা দুর্দাম বর্বরতা আছে, সেইটাতে মীরা তাকে কেবল ভয়ই করেছে, ভালোবাসতে পারেনি। ভালোবাসা না থাকা সত্ত্বেও যদি ওরা কোনো রকমে মিলে-মিশে থাকতে পারত তাহলে ভালোই হতো। কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ মীরাও ছলনা করতে পারে না, নগেনও ক্রোধ সংযম করতে জানে না। মাদ্রাজে যে কয়দিন ওরা আমার কাছে ছিল, সে কয়দিনের দুর্যোগ আমি কখনো ভুলতে পারব না। সেই রকম সম্ভাবনার মধ্যে আমি কি ওকে জোর করে বা অনুরোধ করে পাঠাতে পারি? সেই অপমান, নিষ্ঠুরতা, রাগারাগির মধ্যে ছেলেপুলে নিয়ে সমস্ত জীবন মীরা কাটাবে কী করে? চাকর-বাকর, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন কারো কাছে কোনো আব্রু থাকবে না—তাতে মীরার চেয়ে ওর ছেলেমেয়ের পক্ষে যে বিপদের কারণ হবে। অথচ এও সত্য যে, নগেন ছেলেদের নিয়ে যাওয়া সম্বন্ধে জবরদস্তি করলে তাকে ঠেকিয়ে রাখবার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু ঘটনা যখন উপস্থিত হবে তখন সে কথা ভাবব। কিন্তু মীরা যেন কিছুতেই না মনে করে যে, আমরা ইচ্ছা করছি ও চলে যাক। তেমনতর বেড়া-আগুনের মধ্যে ওকে দগ্ধে মারতে পারব না। ওর সমস্ত জীবন তো ছারখার হয়ে গেছেই, এখন আমার দ্বারা যতটা সম্ভব ওকে রক্ষা করতে এবং সুখী করতে হবেই। সেইজন্য এসম্বন্ধে যতটা দুঃখ সে আমাকে গায়ে পেতে নিতেই হবে। কেননা দুঃখের গোড়াতেও আমিই আছি। যাই হোক, দাদাদের কাছ থেকে মমতা ও সহায়তা থেকে মীরা যেন কিছুমাত্র বঞ্চিত না হয়—অহোরাত্র যে ভয়, ভাবনা ও যন্ত্রণার মধ্যে ও আছে, তার মাত্রা যেন না বাড়ে।’’ (শারদীয় দেশ-১৩৯৬ থেকে উদ্ধৃত।)
এই একটি মাত্র চিঠিতে মীরা দেবীর সংসার নামক অগ্নিকুণ্ডের চিত্র করুণভাবে ফুটে উঠেছে। সেই অগ্নিকুণ্ডের তীব্র তাপদাহ মীরা দেবীর সঙ্গে সঙ্গে কবিকেও দগ্ধ করেছে।
এভাবেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বুকের গভীরে গড়ে উঠেছিল এক কষ্টের পাহাড়, যেখান থেকে সৃষ্টি হয়েছিল ঝরনার উৎসমুখ। সেই ঝরনার উৎসমুখ থেকে সৃষ্ট অসংখ্য গান ও কবিতায় ভরে উঠেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যের সোনার তরী।
আরএন