আঞ্চলিক, কূটনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের কাছে বাংলাদেশ সম্প্রতি প্রাসঙ্গিকের চেয়েও প্রাসঙ্গিক। এ অতি প্রাসঙ্গিকতার অন্যতম কারণ চীনের সাথে বেশি সংযোগ। ভারতের জন্য এটি অবশ্যই উদ্বেগের। তাই তাদের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করাই স্বাভাবিক। আনুষ্ঠানিক তা জানিয়েছেনও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
শুক্রবার দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, চীন থেকে জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য বিষয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের জন্য বেইজিংয়ের প্রস্তাবের প্রতিবেদনগুলো ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে, চীনের প্রস্তাবিত জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার জন্য বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোরের জন্য বেইজিংয়ের প্রস্তাব বিবেচনা করছে-এমন দুটি পৃথক প্রশ্নের জবাবে রণধীর বলেছেন, তারা এ এলাকার এই ধরনের সব ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, দরকার হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। সামগ্রিক নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সমস্ত ঘটনাপ্রবাহকেই ভারত বিবেচনায় রাখবে বলেও জানান তিনি।
মানে দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, সীমান্ত, জল,স্থল, আকাশ কিছুই বাদ পড়ছে না ভারতের নজরদারি থেকে। চীন বা কারো সাথে বিমান কেনার বিষয়টি আকাশের। তিস্তার বিষয়টি পানির। তাই বলে পানির নিচেও? এ বিষয়ে ব্রিফিংয়ে কোনো প্রশ্ন আসেনি। তাই জবাব বা মন্তব্যের বিষয় নেই। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে পানির বা সমুদ্রের তল দিয়ে গ্যাস নিয়ে যাওয়ার কী হবে? বিষয়টি আসলে কোন পর্যায়ে? ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে তা তো চুরি বা ডাকাতি নয়। দস্যূতা চেয়েও জঘন্য। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বাংলাদেশের গ্যাস টেনে নিয়ে যাওয়ার খবরটি এক সময় ঘুরছিল নেট দুনিয়ায়। তখন বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতে রপ্তানি করা হয় না, তবে বেসরকারি উদ্যোগে সড়কপথে ভারতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি রপ্তানি করা হয় বলে তখন জানানো হয়েছিল সরকার থেকে। এছাড়া আগে ভারত থেকে এলএনজি আমদানির যে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তীতে তা বাতিল করেছে। সরকারি ভাষ্যের বিপরীতে স্যোশাল মিডিয়ার এ সংক্রান্ত খবরের বেশ তোড়জোর। সম্প্রতি তা মূল ধারার গণমাধ্যমেও।
বলা হচ্ছে, স্লান্ট ড্রিলের মাধ্যমে গ্যাস নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ধরিয়ে দিয়েছে চীন। তা চলছে অনৈক বছর থেকেই। বিশেষ প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের গ্যাস তুলে নিয়ে যাওয়ার ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিও ও পোস্টে অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে পরোক্ষভাবে গ্যাস অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।
ভাইরাল বক্তব্যে বলা হয়েছে, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের চাপের পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বিশেষ ধরনের দিকনির্দেশিত ডিরেকশনাল ড্রিলিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস অন্যদিকে প্রবাহিত করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৯০ সালে ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে তেলক্ষেত্র নিয়ে উত্থাপিত বিতর্কের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।
আরো দাবি করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর বাংলাদেশের কয়েকটি অফশোর ব্লকে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত উৎপাদন শুরু হয়নি। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন বিলম্বিত হয়েছে এবং দেশকে ব্যয়বহুল আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, চীন আধুনিক অফশোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এ ধরনের কোনো চুক্তি বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এ সংক্রান্ত খবর এখন মূলধারার গণমাধ্যমেও। যেখানে বলা হচ্ছে- বঙ্গোপসাগরের নীল পানির হাজার হাজার ফুট গভীরে এ অবিশ্বাস্য আন্তর্জাতিক ডাকাতি চলছে। এক ফোঁটা রক্তপাত না ঘটিয়ে কোনো কামানের গোলা না ছুড়ে সম্পূর্ণ নীরবে কাজটি করেছে ভারত। আর এ বৈজ্ঞানিক চুরির গোপন নকশা এত বছর পর ফাঁস করেছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন।
বিগত ১৭ বছর ধরে শেখ হাসিনা সরকারের প্রশ্রয়ে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টাকার সম্পদ-প্রাকৃতিক গ্যাস। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই কৌশল একেবারে নতুন কিছু নয়। ১৯৯০ সালে যখন সাদ্দাম হোসেনের ইরাক কুয়েত আক্রমণ করেছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল এই স্লাড রিলিং। ইরাক অভিযোগ করেছিল কুয়েত আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে মাটির নিচ দিয়ে বাঁকা পাইপ ঢুকিয়ে ইরাকের বিখ্যাত রুমায়না অয়েল ফিল্ড থেকে তেল চুরি করছে। এই তেল চুরিকে কেন্দ্র করে পৃথিবী কাঁপানো মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলেছে দেড় দশক ধরে সাগরে। দেশে দেশে তেল –গ্যাস চুরির ঘটনা খুব নীরবে এবং লোকচক্ষুর আড়ালেই হয়। ২০১২ সালে সমুদ্র আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে বাংলাদেশ যখন এই বিশাল সমুদ্রসীমা পেয়েছিল তখন সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। ভাবছিল ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির হাত ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবার পরিবর্তন হবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে চিত্রনাট্য লেখা হয়েছিল ভিন্নভাবে। সমুদ্র জয়ের পরপর বঙ্গোপসাগরে বেশ কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেলে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেগুলো কোনো আন্তর্জাতিক মানপত্র ছাড়াই তুলে দেয়া হয় ভারতের দুটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি এবং ওয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের হাতে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়। বিশ্ববাজারে যখন গ্যাসের জন্য হাহাকার তখনই ভারতের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ব্লকগুলো থেকে কোনো বাস্তব মৌখিক প্রয়োগ ছাড়াই উল্লেখযোগ্যভাবে উৎপাদন শুরু করেনি। তারা বছরের পর বছর ফাইল আটকে রেখে সময়ক্ষেপণ করেছে এবং পুরো প্রক্রিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অফশোর গ্যাসক্ষেত্রে দিকনির্দেশিত ড্রিলিং একটি স্বীকৃত প্রযুক্তি হলেও আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এমন অভিযোগ প্রমাণের জন্য বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক তথ্য, উৎপাদন উপাত্ত, সিসমিক জরিপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের স্বাধীন কারিগরি তদন্ত প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামুদ্রিক গ্যাসসম্পদ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বঙ্গোপসাগরের গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে যেকোনো অভিযোগ বা বিতর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিস্কার করা উচিৎ। এটি হেলাফেলার বিষয় নয়। এ সংক্রান্ত আশপাশের হালনাগাদ তথ্য দরকার। মিয়ানমার সম্প্রতি ৯৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট)-এর একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এশিয়ার এই অঞ্চলে এর আগে কখনও এত বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও সরকারি পরিকল্পনায় নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন বেসিনে বড় আকারের গ্যাস আবিষ্কার বাংলাদেশের অফশোর অঞ্চলেও একই ধরনের ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো থাকার সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় অফশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘শুয়ে গ্যাস ফিল্ড’। এটির অবস্থান বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্রসীমার খুব কাছাকাছি রাখাইন বেসিনে। এ একই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে ‘শেউই’, শেউই ফু ও ‘মিআ’ গ্যাসক্ষেত্রও পাওয়া গেছে— এগুলো একই গ্যাস সিস্টেমের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্র একটি বিস্তৃত ভূ-তাত্ত্বিক গ্যাস বলয়ের অংশ—যা বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলের কাছাকাছি বিস্তৃত।
একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের অফশোর অংশে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদন এলাকা হলো কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিন। অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে এ বেসিনের গভীর সমুদ্র ব্লকগুলোতে একাধিক বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ভেতরে থাকা অফশোর ব্লকগুলোতে সম্ভাব্য গ্যাস মজুতের সম্ভাবনা রয়েছে। এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবে এগুলোকে সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্র এলাকার মধ্যে গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকসহ মোট ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর ৫টি বিদেশি কোম্পানি ডাটা প্যাকেজ কিনেছে। এগুলো হচ্ছে- সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি ক্রিসএনার্জি, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক কোম্পানি বিরিংগিয়া এনার্জি গ্লোবালের লোকাল এজেন্ট বিরিংগিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, পিয়াল এনার্জি অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, জাপানি কোম্পানি অনোডা ইনকরপোরেটেড এবং নরওয়েজিয়ান কোম্পানি রিস্টাড এনার্জি। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
এর আগে ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তখন ৭টি বহুজাতিক কোম্পানি দরপত্র কিনলেও রহস্যজনকভাবে কেউই জমা দেয়নি। পরবর্তীকালে এর কারণ অনুসন্ধানে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিটির সুপারিশে পিএসসি-২০২৬-এ একাধিক সংশোধনী আনা হয়। এতে গ্যাসের দাম নির্ধারণে পাঁচ বছরের গড় বাজারদর বিবেচনা এবং তথ্য প্যাকেজের মূল্য ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দরপত্র নিয়ে আগের সেই লুকায়িত রহস্য ভেদ করা জরুরি। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের গ্যাস টেনে নিয়ে যাওয়ার খবরের সত্যতা জানানো উচিৎ। ভারত আর মিয়ানমার যে কমন সীমান্ত এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকছে-এ প্রশ্নের হিল্লাও প্রত্যাশিত। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংসদ অধিবেশনে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট কাটাতে স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ’দ্রুত’ মানে কতো সময়? তা বাস্তবে দেখার অপেক্ষায় মানুষ।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন