উত্তরবঙ্গের এক কৃষক ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আকাশের দিকে তাকান। বৃষ্টি হবে কি হবে না—এই প্রশ্নই যেন তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করে। অথচ তাঁর গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে তিস্তা নদী। বর্ষাকালে যে নদী উন্মত্ত হয়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেই নদীই শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় সরু জলধারায়। নদী আছে, কিন্তু পানি নেই; সেচের জমি আছে, কিন্তু ফসল নেই; মানুষের শ্রম আছে, কিন্তু উৎপাদনের নিশ্চয়তা নেই। তিস্তার এই বৈপরীত্য আজ শুধু একটি নদীর সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের প্রকাশ্য সমর্থন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি এটি কেবল একটি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প হয়, তবে ভারত কেন উদ্বিগ্ন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে তিস্তার গুরুত্ব বুঝতে হবে।
তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একসময় এই নদী উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং জীববৈচিত্র্যের প্রাণ ছিল। কিন্তু উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। অনেক সময় তিস্তায় পানির প্রবাহ এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে নদীর বুকে মানুষ হেঁটে পারাপার করে।
বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিস্তা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তিস্তার পানির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু পানির অভাবে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ ব্যাহত হয়। কৃষকের উৎপাদন কমে, আয় কমে, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং অনেক পরিবার দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে।
অন্যদিকে, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে। অর্থাৎ তিস্তা এখন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে খরা ও বন্যার নদী।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ধারণা আসে। নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন—এসবই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদীভাঙন হ্রাস এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু প্রকল্পটি যখন চীনের সহযোগিতায় এগোতে শুরু করল, তখনই ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ কেবল পানি নয়, ভূরাজনীতি।
তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি। এই করিডর, যা "চিকেনস নেক" নামেও পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ। মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, যদি চীন তিস্তা প্রকল্পে বড় আকারে যুক্ত হয়, তবে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলে প্রযুক্তিগত, প্রকৌশলগত কিংবা অবকাঠামোগত উপস্থিতি তৈরি করতে পারে। যদিও চীন বলছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ উন্নয়নমূলক এবং কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, তবুও ভারত এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই উদ্বেগ পুরোপুরি নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, বন্দর উন্নয়ন, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ ভারতের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নের জন্য যে দেশের কাছ থেকে সবচেয়ে উপযোগী সহযোগিতা পাওয়া যাবে, সেই সহযোগিতা গ্রহণ করার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতাকে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি বানানো উচিত নয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে যে—তিস্তার মূল সমস্যা কি অবকাঠামো, নাকি পানির ন্যায্য হিস্যা?
বাস্তবতা হলো, নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প যত উন্নতই হোক না কেন, যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না আসে, তবে প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে যাবে। তাই তিস্তা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে একটি সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার (Equitable and Reasonable Utilisation), অন্য রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা (No Significant Harm Principle), তথ্য বিনিময়, পূর্বপরামর্শ এবং সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ বিষয়ক কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের বিভিন্ন নীতিমালায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও সব দেশ এসব চুক্তির পক্ষ নয়, তবুও নীতিগুলো আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়।
তিস্তার ক্ষেত্রেও এই নীতিগুলোর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। কারণ একটি আন্তঃসীমান্ত নদীকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে ভাটির দেশের কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় গভীর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তা কেবল পানির উৎস নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তারও একটি বড় ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, তখন সেচনির্ভর কৃষির গুরুত্ব আরও বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে পানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। কৃষি থেকে আয় কমে গেলে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হয়। এতে শহরে কর্মসংস্থান, আবাসন এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ তিস্তার পানি সংকট কেবল একটি নদীর সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।
চীনের অংশগ্রহণকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ তাই একদিকে যেমন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বাংলাদেশের উদ্বেগ জীবিকা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশেরও উচিত বিষয়টিকে আবেগ নয়, কৌশল দিয়ে পরিচালনা করা। একদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কোনো পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে।
একই সঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির সুষম ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নদীকে শুধু প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।
বস্তুতপক্ষে, তিস্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—ন্যায্য পানি বণ্টন, বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আস্থাভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা। চীন, ভারত কিংবা অন্য যে কোনো উন্নয়ন সহযোগীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গঠনমূলক সংলাপকে আরও কার্যকর করতে হবে। কারণ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না, যদি নদীতে পর্যাপ্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হয়।
তিস্তার পানি কোনো দেশের একক সম্পদ নয়; এটি একটি অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ, যার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। তাই তিস্তাকে ভূরাজনীতির দাবার গুটি হিসেবে নয়, বরং মানবকল্যাণের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। সুতরাং ভারতের উদ্বেগ এখানে মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।