Monday | 22 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 22 June 2026 | Epaper
BREAKING: দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত      ২২ বিচারককে বদলি করলো সরকার      ছয় জেলায় সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা পেলেন ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা      বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      বিশ্বকাপ ইতিহাসে মিশরের প্রথম জয়      দেশের প্রতি আমাদের কী কর্তব্য আছে, সেটা ভাবুন: প্রধানমন্ত্রী      কেপ ভার্দের রূপকথার গল্প যেন চলছেই      

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফর: সার্বভৌম কূটনীতির সফল সূচনা করল বাংলাদেশ

প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ৯:১৮ পিএম   (ভিজিট : ৩২)

বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ক্রমেই জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে তৎপর, অন্যদিকে চীন তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্য নির্মাণের চেষ্টা করছে। এই মেরুকরণের যুগে মাঝারি আকারের রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—কোনো এক পক্ষের বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে সেই বাস্তবতার আলোকে দেখলে এটি নিছক একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। এটি মূলত বাংলাদেশের নতুন সরকারের কূটনৈতিক দর্শন ও ভবিষ্যৎ কৌশলের প্রথম বড় পরীক্ষাও বটে।

মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নে বাস্তবমুখী অবস্থান গ্রহণ। মালয়েশিয়ায় কর্মরত লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; তারা দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারে নানা অনিয়ম, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে ছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যে স্পষ্টভাবে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তকরণ, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বিশেষ করে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী করার যে যৌথ অঙ্গীকার দুই দেশ করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ উপকার হবে।

তবে এই সফরের গুরুত্ব শ্রমবাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল অর্থনীতি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনীতি মালয়েশিয়ার সঙ্গে এই সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার ও আরসিইপিতে অন্তর্ভুক্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি নতুন মাত্রা। কারণ আগামী দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র হবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। সেই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করতে পারলে রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর। কারণ চীন আজ শুধু বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার নয়; অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, সেতু, সড়ক, বন্দর এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক, চুক্তি এবং কর্মপরিকল্পনা স্বাক্ষরিত হবে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর গভীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ বর্তমান বিশ্বে চীনকে ঘিরে প্রতিটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা মানেই কি কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া? এর উত্তর হলো—না।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, রাশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ—সবার সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা স্বার্থ এতটাই বহুমাত্রিক যে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

এ কারণেই কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের কৌশল, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে শুধুমাত্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়।

এই বাস্তবতাই ব্যাখ্যা করে কেন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানের রাষ্ট্রদূতদের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্বেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ আজ আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনবহুল দেশ নয়। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক, আঞ্চলিক সংযোগ, নীল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। বাস্তবতা হচ্ছে, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত কারণে ভারত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। কিন্তু সীমান্তে পুশইন, তিস্তা চুক্তির দীর্ঘসূত্রতা, গঙ্গার পানিবণ্টন এবং ভিসা জটিলতার মতো বিষয়গুলো সম্পর্ককে সময়ে সময়ে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো যেমন বাংলাদেশের অধিকার, তেমনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নও বাংলাদেশের প্রয়োজন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বাস্তববাদী কূটনীতি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আদর্শিক আবেগের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করেছিলেন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে।

আজকের পৃথিবীতে সফল রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যারা পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে নিজেদের উন্নয়নের সুযোগে পরিণত করতে পারে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত তার উদাহরণ। বাংলাদেশও যদি দক্ষ কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে একই ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফর সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই সফরের মধ্য দিয়ে যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তা হলো—বাংলাদেশ কারও প্রভাব বলয়ে আবদ্ধ হতে চায় না; বাংলাদেশ চায় সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, সবার সঙ্গে সহযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অংশীদারত্ব।

পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য কোনো একক সফর দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তবে কিছু সফর একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যাত্রাপথের দিকনির্দেশনা দেয়। মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের জন্য তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদি এই সফরের অর্জনগুলো বাস্তবায়িত হয়, যদি শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে, তাহলে এটি শুধু একটি সফল রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম, আত্মবিশ্বাসী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির নতুন যুগের সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশ কারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ নয়, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থের অংশীদার। বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির ছায়ায় নয়, বরং নিজের অবস্থান ও সক্ষমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে যেতে চায়। বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করে।
আজকের পরিবর্তিত বিশ্বে এটিই হলো একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পরিচয়। আর সেই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফরকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতির সফল সূচনা বলেই বিবেচনা করা যায়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close