Wednesday | 17 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Wednesday | 17 June 2026 | Epaper
BREAKING: কঙ্গোর বিপক্ষে আজ রাতে মাঠে নামছে রোনালদোর পর্তুগাল      যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী      প্রথম টি-টোয়েন্টিতে অস্ট্রেলিয়ার কাছে বাংলাদেশের হার      হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৪ জনের মৃত্যু      ‘আই হ্যাভ এ প্লান’ নিয়ে ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী      দেশের কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      দেশের ৪০ লাখ কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী      

ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস: সম্প্রীতি, শান্তি ও মানবতার পক্ষে অঙ্গীকার

প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৬:৪৩ পিএম   (ভিজিট : ৬৪)

আমার মা বলতেন, "মাটি হ, কখনো তেজ দেখাবি না। সব সময় শান্ত ভাষায় কথা বলবি, ভদ্র হ।" খেলতে গিয়ে কেউ যদি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত, মাকে এসে অভিযোগ করলে তিনি বলতেন, "মাফ করে দে, ও খারাপ হোক, তুই খারাপ হবি না। পাল্টা মাইর দিবি না কাউকে। অভিযোগ করা বন্ধ কর, ধৈর্য ধর। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখ, ধৈর্য তোকে অনেক উপরে নিয়ে যাবে।" আমার মায়ের এই কথাগুলো আমার খুব মনে পড়ে।

আম্মা অবসর যাওয়ার কিছুদিন পর থেকেই, বিগত ১৬ বছর ধরে আমাদের বাসায় থাকেন। এখনো যদি কারো সঙ্গে একটু উচ্চস্বরে কথা বলি, যেমন—ড্রাইভার অনেক দেরি করে আসছে, আমার কোনো জরুরি সভার সময় পার হয়ে যাচ্ছে বা দেরি হয়ে গেছে—যদি একটু জোরে ড্রাইভারকে বলি, "কেন তুমি রোজ রোজ দেরি করে আসো? তোমার কোনো দিন সময়জ্ঞান হলো না?" এভাবে কথা বললে এখনো তিনি বলেন, "শান্তভাবে সমস্যাটা বুঝিয়ে বল, উচ্চস্বরে কথা বলবি না।"

আমাদের ড্রাইভার প্রায় ২০ বছর ধরে আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। আমাদের বাসার যে স্টাফ, সেও প্রায় ১৪ বছর আমাদের এখানে চাকরি করে। আমাদের অফিসের ২৭ বছর, ১৭ বছর, ১৯ বছরের মতো দীর্ঘদিনের সহকর্মী রয়েছেন অনেক। এর কারণ হলো, আমার ধৈর্য একেবারে কম নয়। মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে বললেও যৌক্তিকভাবে কথা বলি।

আমার আম্মার বয়স ৮৯, অথচ উনি আমাকে এখনো বকা দেন এবং শাসন করেন। উনার সঙ্গে জোরে কথা বলার আমাদের সাহস নেই। হঠাৎ যদি আমার বাইরে গিয়ে বাসায় আসতে একটু দেরি হয়, ফোনের পর ফোন। একাকী ভালো লাগে না বলে অভিমান করে বসে থাকেন। আমি ওনার দুই পা ধরে বলি, "মা, মাফ করে দাও। এখন থেকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরব।"

বনশ্রী সমিতির সভা বা দাতাদের ডিনারে আম্মাকে নিয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু পারিবারিকভাবে রেস্টুরেন্টে অথবা আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে অবশ্যই আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে যাই।

আমাদের হাজব্যান্ড-ওয়াইফের মধ্যে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খুব একটা তর্ক লাগে না বললেই চলে। যদি কখনো বছরে দু-একবার একটু কথা কাটাকাটি হয়, তাও আবার আইডিওলজিক্যাল কারণে বিতর্ক হয়। ওনার বিশ্বাস ও আমার বিশ্বাস এক রকম হয় না। একে অপরের আইডিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উভয়ের চেষ্টা থাকে।

এসব কথাবার্তা আমার মা শুনলে উঠে এসে আমাকে হাত ধরে নিয়ে অন্য ঘরে চলে যান এবং বলেন, "জামাই তোর বয়সে বড়, তুই কেন তার সঙ্গে তর্ক করবি? তোকে আমি সারা জীবন কী শিখিয়েছি?"

ব্যক্তিগত কথাগুলো আজ আমাকে বলতে হলো। কারণ আমার মা আমাকে যা শিখিয়েছেন, আমার সন্তানদেরও আমি তাই শিখিয়েছি। আজ পর্যন্ত আমার দুটি সন্তানের একজনও আমার সঙ্গে অথবা তার বাবার সঙ্গে জোরে কথা বলেনি। এটা আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি।

এই কারণে বলতে হলো যে, আমাদের সন্তানদের আমরা কী শেখাই, এটা আমাদের এখন ভাববার বিষয়। কেন তারা রাস্তায় গিয়ে অথবা সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ায়? কেন নোংরা কথা বলে? আর কেনইবা নারীদের গোপনাঙ্গ নিয়ে অশ্লীল স্লোগান দেয়?

আমরা অভিভাবকরা জানি, বিষয়গুলো নোংরামি। কিন্তু জানার পরেও আমরা অভিভাবক হয়ে এই প্রজন্মকে সুপথে আনতে কী পদক্ষেপ নিয়েছি? আমাদের শিক্ষকরা আমাদের কী শিখিয়েছেন? কেন আমাদের প্রজন্মের একটা বড় অংশকে সুপথে আনতে পারছি না?

আমি জানি না, এটা বাবা-মায়ের অযোগ্যতা নাকি প্রজন্মের বিবর্তন। এটা যাই হোক না কেন, বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না। এর থেকে উত্তরণের পথ আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে।

যদি বলি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা, সেখানেও হিংস্রতা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, উসকানিমূলক ভাষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার সমাজে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে ভয়াবহভাবে। সহিংসতা যেন আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।

রাজনৈতিক মতভেদ গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয় হলেও তাতে রং লাগিয়ে, হাঁপিয়ে-ফুলিয়ে, মিথ্যা জুড়ে দিয়ে বিষয়টিকে ভয়াবহ করে তোলা হচ্ছে। তখন তা ঘৃণা ও সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে এবং পুরো জাতিকে এর মূল্য দিতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। এতে করে আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি সংঘটিত হয়।

ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সহিংসতার অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে, যার ফলে আমাদের দেশে বিনিয়োগ ভয়াবহভাবে কমে যায়। যখন একটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায় অথবা ধর্মীয় সহিংসতা সড়কজুড়ে দেখা যায়, মসজিদ থেকে মানুষ দা-তলোয়ার, লাঠি নিয়ে ভিমরুলের চাকের মতো বের হয়, তখন বিদেশিদের মনে ইসলামোফোবিয়ার সৃষ্টি হয়।

তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। তারা নিরাপদ পরিবেশ খোঁজেন এবং বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে আমাদের দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ কমে যায়।

কিছুদিন আগে আমাদের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন বিলিয়নিয়ার যুক্তরাজ্য থেকে বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় কথাবার্তাও বলেছিলেন। কিন্তু দেশে এই হিংস্র এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ থাকার কারণে তিনি ভারতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন—এ বিষয়টি আমরা সবাই জানি। আমরা এও জানি, তার একমাত্র কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা।

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের আয়-রোজগার কমে যাচ্ছে। সহিংসতা, অবরোধ, সংঘর্ষ বা ভাঙচুরের কারণে দোকানপাট, বাজার, পরিবহন ও শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটনের জন্য একটি বিশাল সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের বিদেশি পর্যটকদের। একটি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরেই পর্যটনশিল্পের অগ্রগতি নির্ভর করে এবং এই বিষয়টি পর্যটকদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার খবর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে। পর্যটক আসে না বিধায় ডলারও আসে না।

সম্প্রতি শুনছি, রাম মন্দির বন্ধের জন্য হুজুররা উঠে-পড়ে লেগেছে। পথে পথে মিছিল করে বেড়াচ্ছেন হিংস্রভাবে। আরে ভাই, হিন্দুরা বিভিন্ন ধরনের মূর্তি বানাবেন, আমরা মসজিদ বানাব, খ্রিস্টানরা গির্জা বানাবে, বৌদ্ধরা বুদ্ধের বড় মূর্তি বানাবেন—এটাই তো স্বাভাবিক। অন্যরা বাধা দেওয়ার কে? যে যার ধর্ম পালন করবে।

সহিংসতা মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলোর পুনর্নির্মাণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় করতে হয়েছে কেবলমাত্র মাথামোটা মানুষগুলোর জন্য। এ সকল ধ্বংসের কারণ উন্নয়নের অন্যান্য খাতকে প্রভাবিত করে।

এ দেশের জনগণ অনেক বেশি, সেই অনুপাতে পুলিশ নেই। তাই আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা একটি কঠিন ব্যাপার। এছাড়াও মানুষের মধ্যে নৈতিকতার অবক্ষয় হওয়ার কারণে আইন অনেক ক্ষেত্রেই ম্যানিপুলেট হচ্ছে। যত পুলিশ আছে, সেই অনুপাতে তাদের কাছে অস্ত্র নেই। যে অস্ত্র ছিল, তা লুট হয়ে গেছে; কিন্তু অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করার কতটুকু সুযোগ হয়েছে, তাও আমার জানা নেই।

সহিংসতার কারণে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং মানুষ বেকার হয়ে গেছে। বিশাল আকারে যৌনকর্মী বেড়েছে, বেকারত্বের কারণে মানুষ চাঁদাবাজি করে খাচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে। আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছে না। কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দেখলে আমাদের খুবই হতাশ হতে হবে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.৮%, ২০২৪ সালে কমে হয়েছে ৪.২% এবং ২০২৫ সালে একেবারেই কমে হয়েছে ৩.৫%। জিডিপির এই দুরবস্থা দেখতে হতাশায় মনটা খারাপ হয়ে যায়। লোকেদের উন্নয়ন হয় আর আমাদের হয় ধ্বংস।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভারতে ২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮.২%, ২০২৪ সালে কমে হয়েছে ৬.৫% এবং ২০২৫ সালে একটু বেড়ে হয়েছে ৬.৬%। পাকিস্তানের বিষয়ও তাই। ২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল -০.২%, ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ২.৬% এবং ২০২৫ সালে বেশ খানিকটা বেড়ে হয়েছে ৩.১%।

যে দেশ বিশ্বের বাজারে ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা পেছনের দিকে হাঁটছি। এই পেছনে হাঁটার কারণ হলো, আন্তর্জাতিক চক্রান্তে আমরা নিজেরাই জড়িত হয়ে গেছি। নিজের ভালো আমরা নিজেরাই চাইছি না। ওদের টোপে পা দেওয়া আমাদের ঠিক হয়নি। শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থের জন্য দেশ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের ঠিক হয়নি।

বর্তমানে আমাদের দেশে সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। ধর্মের নামে হাজার তরিকায় বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। এক তরিকার মানুষ অন্য তরিকার মানুষের নামে বদনাম করছে এবং তাদের সহ্য করতে পারছে না। একে অপরের প্রতি ঘৃণামূলক বক্তব্য মানুষকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলছে। ফলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এতে করে সম্প্রীতির অবক্ষয় সাধিত হচ্ছে।

ধর্ম, জাতি, ভাষা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদ্বেষ ছড়ালে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর কারণে পারিবারিক ও সম্প্রদায়িক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ঘৃণা ও বিভক্তির সংস্কৃতি পরিবার এবং সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। বন্ধুত্ব, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিশাল ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এখানে মতের ভিন্নতাকে সম্মান করা হয় না, মানবাধিকারের বিষয়টি চর্চা করতে মানুষ ভুলে যাচ্ছে। এই কারণে এ দেশে মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফলে জনমানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে এবং জনগণ মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মন খুলে কথা বলার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ঘৃণামূলক বক্তব্যের লক্ষ্যবস্তু হওয়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব সময় আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং একই সঙ্গে হতাশা ও মানসিক চাপের মধ্যে বসবাস করছে।

অবিরাম বিদ্বেষ, অপমান ও সামাজিক বর্জনের ফলে মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। ফলাফল হিসেবে শিশু ও তরুণদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিশুরা যখন ঘৃণা, সহিংসতা ও বৈষম্যের পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তখন তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা অসহিষ্ণু আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে পারে।

মানুষে মানুষে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে এবং একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সহিংসতাজনিত আহত ও নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে আমাদের দেশের যুব সম্প্রদায় বসবাস করছে। অনেকেই রাজনৈতিক সহিংসতায় শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন এবং অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

পুলিশ বলছে, আমরা গুলি করিনি। রাজনীতিবিদেরা বলছেন, পুলিশ গুলি করেছে। সত্যিকারের তদন্ত কতটুকু হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফ্যাক্ট চেক না করলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এই দেশে কোনো দিনই সম্ভব নয়।

সহিংসতা করতে অনেকেই মুখোশধারী হিসেবে অন্যান্য দলে যুক্ত হচ্ছেন এবং সেখানে গিয়ে সহিংসতা করছেন। এতে করে ওই দল জনগণের কাছে কতটুকু বিশ্বস্ত থাকে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রায়ই বাস্তবে মানুষকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়, যার ফলে মানুষ আহত বা নিহত হয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, ভয় এবং উদ্বেগ শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

নারী, শিশু ও প্রবীণদের ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সহিংস পরিস্থিতিতে নারী, শিশু এবং প্রবীণরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন এবং তারাই ধর্ষণ বা খুনের শিকার হচ্ছেন। তারা প্রায়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এবার আসি ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতা প্রতিরোধে আমরা কী কী করতে পারি, সেই বিষয়ে। আমাদের কী কী করণীয়, সেটা আমাদের দেশের সকলের অবশ্যই জানা দরকার।

এ সকল নেতিবাচক বক্তব্য, সামাজিক বিভাজন এবং সহিংসতা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জাতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য, নতুন করে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের বরাদ্দ প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে পারলেই একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের প্রধান করণীয় হলো ভিন্নমতকে সম্মান করা। প্রত্যেক মানুষের মতামত, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। মতের অমিলকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে সম্মান ও সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার কিছুতেই করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় গুজব, মিথ্যা তথ্য ও উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

মঙ্গলের জন্য আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে উচিত ঘৃণামূলক ভাষা পরিহার করা। ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, পেশা, রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে অপমান বা হেয়প্রতিপন্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঘরে ঘরে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা একান্ত প্রয়োজন। পরিবার ও স্কুলে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচারের মূল্যবোধের বিষয়ে শিক্ষা ও নিজ জীবন এবং পরিবারের মধ্যে চর্চা শুরু করতে হবে।

শিশুদের অবশ্যই ইতিবাচক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। দেশের প্রত্যেকটি পরিবারের শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন মত ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, মানবাধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা দিতে হবে। একইভাবে প্রতিটি স্কুলে এসব শিক্ষা কারিকুলামে সংযুক্ত করতে হবে।

সামাজিকভাবে আমাদের যা করণীয় তা হলো, সম্প্রীতি ও সংলাপ বৃদ্ধি করা। বিভিন্ন ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে।

সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ঘৃণা, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করা দরকার।

আমাদের দেশের যুবসমাজকে উল্লেখিত কাজে সম্পৃক্ত করা খুবই প্রয়োজন। তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের জড়িত করতে হবে, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচিতে যুক্ত করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা চালাতে আইনের বাস্তবায়ন খুবই প্রয়োজন। মিথ্যা তথ্য প্রচারকারীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা ঘৃণা ছড়ায়, তাদের বয়কট করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা প্রচার করতে হবে।

স্থানীয় বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে এলাকাভিত্তিক বিরোধ ও সংঘাত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারিভাবে এনজিও ও নাগরিক সমাজকে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে হবে, যাতে তারা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিউনিটিতে ঘৃণামূলক বক্তব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যেখানে সরকারিভাবে নির্দেশ দেওয়া হবে, এ ধরনের ঘৃণা ছড়ানোর কোনো কাজ যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না ঘটে।

এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে শান্তি ও সম্প্রীতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। তরুণ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা এবং কমিউনিটি নেতাদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি।

গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করে ঘৃণামূলক বক্তব্য, সহিংসতা এবং সামাজিক বিভাজনের কারণ ও প্রভাব নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে নীতিনির্ধারকদের তথ্য সরবরাহ করতে হবে।

সহিংসতা ও ঘৃণার শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন সেবা প্রদান করতে হবে। ভুক্তভোগীদের সহায়তা করা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

এই মুহূর্তে আমাদের অনলাইন নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সচেতনতার খুবই প্রয়োজন। ভুয়া খবর, সাইবার বুলিং এবং অনলাইন বিদ্বেষ মোকাবিলায় ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের করণীয় অনেক কিছুই আছে। যেমন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এই মুহূর্তে খুবই প্রয়োজন। বিদ্বেষমূলক উসকানি, সহিংসতা এবং ঘৃণামূলক অপরাধের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় শান্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাঠ্যক্রমে সহনশীলতা, মানবাধিকার, নাগরিকত্ব শিক্ষা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি যদি না হয়, তাহলে বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক বৈষম্য অনেক সময় সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বৃদ্ধি করা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে না নিলে গুজব, উসকানি এবং ঘৃণামূলক প্রচারণা দিনে দিনে বেড়েই যাবে। তাই এগুলো শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, প্রবীণ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের শিশু ও যুব সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে জাতীয় সম্প্রীতি কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির জন্য দেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করার সময় এসেছে।

সোসাইটি ও কমিউনিটি নেতাদের করণীয় অনেক কিছু রয়েছে। যেমন, শান্তির দূত হিসেবে ভূমিকা পালন করা। স্থানীয় নেতা, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সমাজকর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।

বিরোধ নিরসনে এলাকায় এলাকায় কমিটি গঠন করা দরকার, যারা কেবলমাত্র শান্তি বিস্তারের জন্যই কাজ করবে। তারা ছোটখাটো বিরোধ ও উত্তেজনা দ্রুত সমাধানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মধ্যস্থতা করতে পারবে।

এলাকাভিত্তিক নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা করা এখন সময়ের দাবি। মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা আয়োজন করতে হবে।

যুব নেতৃত্ব বিকাশের জন্য তরুণদের ইতিবাচক নেতৃত্ব, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।

সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতা একটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক অগ্রগতির জন্য বড় হুমকি। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সকল স্তরের অংশগ্রহণ ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।

সম্মান, সহনশীলতা, সংলাপ, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।

ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধে সরকার, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

ঘৃণামূলক বক্তব্য শুধু শব্দের আঘাত নয়; এটি সমাজে বিভক্তি, সহিংসতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের ঘৃণার পরিবর্তে সম্মান, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

১৮ জুন ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ঘৃণা নয়, মানবতা; বিভাজন নয়, সম্প্রীতি; সহিংসতা নয়, শান্তি।

লেখক: নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close