শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার যে আমি অর্থনীতিবিদ নই। তবে একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এই বাজেট নিয়ে আমার বিশ্লেষণ তুলে ধরতে চাই। এই বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ না থাকলে এটিকে আমি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বাজেট বলতে পারতাম। যাহোক, আমাদের অর্থনীতি কত বড় হলো, জিডিপি কত বাড়ল কিংবা মাথাপিছু আয় কত হাজার ডলারে পৌঁছাল—সাধারণ মানুষের কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। এসব পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি অর্থ বহন করে না, যদি বাজারে গিয়ে এক কেজি চাল, এক লিটার তেল বা এক পাতার ওষুধ কিনতে গিয়ে তাকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়। অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ হয় মানুষের রান্নাঘরে, হাসপাতালের বিল এবং মাস শেষে একটি পরিবারের হিসাবের খাতায়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যত সাফল্যের গল্প বলা হয়েছে, তার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের নির্মম বাস্তবতায়।
গত কয়েক বছরে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। বাজারে আগুন, চিকিৎসা ব্যয়ে লাগামহীন বৃদ্ধি, শিক্ষা খরচের চাপ এবং সীমিত আয়ের বাস্তবতায় লাখো পরিবার তাদের স্বপ্ন, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বহু মধ্যবিত্ত পরিবারও ধীরে ধীরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্রতার ঝুঁকিতে পড়েছে। অথচ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল এই শ্রেণিটিই।
এই প্রেক্ষাপটে এবারের জাতীয় বাজেট একটি ভিন্ন বার্তা নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন পর এমন একটি বাজেট দেখা গেল যেখানে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কর বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটার সহজ পথ বেছে না নিয়ে সরকার করজাল সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষি উপকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর কর ও শুল্ক কমিয়ে জনগণের ব্যয় কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
সত্য কথা বলতে কী, রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, সরকারের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও থাকতে পারে; কিন্তু জনগণের কল্যাণে নেওয়া পদক্ষেপকে কেবল রাজনৈতিক কারণে অস্বীকার করা বস্তুনিষ্ঠতার পরিচয় নয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে বাজেটটি উপস্থাপন করেছে, সেখানে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রের নজর এবার কর্পোরেট মুনাফার চেয়ে সাধারণ মানুষের সংসারের দিকে বেশি।
বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর ব্যাপক করছাড়। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর করহার কমানো হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো একটি রাজস্ব নীতি; কিন্তু একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী কিংবা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীর কাছে এটি তার সন্তানের মুখে একবেলা খাবার নিশ্চিত করার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত একটি সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় খাদ্যপণ্যে পড়ে। আর খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শিকার হয় দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। ফলে খাদ্যপণ্যের ওপর কর কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাষ্ট্র যখন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেটি কেবল অর্থনীতি পরিচালনা করে না, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতাও রক্ষা করে।
একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে এবারের বাজেটের মানবিক মুখ বলা যায়। বাংলাদেশে অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে নিঃস্ব হয়ে যায়। একটি হার্টের স্টেন্ট, একটি কিডনি ডায়ালাইসিস বা ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক পরিবারের জন্য কার্যত মৃত্যুদণ্ডের সমান আর্থিক চাপ তৈরি করে। সেই বাস্তবতায় হার্টের রিং, কিডনি ডায়ালাইসিস উপকরণ, ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কাঁচামাল এবং চোখের লেন্সের শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রমাণ।
তবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এবারের বাজেটের গুরুত্ব কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধির অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্যও গভীর। কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য যখন বাড়ে, তখন শুধু প্রবৃদ্ধি দিয়ে সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায় না। দরকার হয় একটি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসে। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি বড় উদ্যোগ।
বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকারের যে পরিকল্পনা, তা বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ৪১ লাখ নারীকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা প্রদানের ঘোষণা শুধু দরিদ্র পরিবারের আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত। আগামী অর্থবছরে এই কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে এর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নীতিরই প্রতিফলন।
প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ট্রেনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভ্রমণ এবং মেট্রোরেলের ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণাও একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে। জীবনের দীর্ঘ সময় দেশ ও সমাজের জন্য অবদান রাখা মানুষদের প্রতি এই সম্মান শুধু আর্থিক সুবিধা নয়, এটি একটি সভ্য সমাজের মূল্যবোধেরও প্রতিফলন।
একই সঙ্গে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারী ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। বয়স্ক ভাতা ৭০০ টাকায় উন্নীত করা, উপকারভোগীর সংখ্যা ৬২ লাখে বৃদ্ধি, বিধবা ভাতার আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাসিক ভাতা ১ হাজার টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা ও বৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্তও বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। ক্যানসার, কিডনি রোগ কিংবা লিভার সিরোসিসের মতো রোগে আক্রান্ত একটি পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় প্রায়ই সর্বস্ব হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই বাস্তবতায় এককালীন সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা নিঃসন্দেহে একটি মানবিক সিদ্ধান্ত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতা প্রদানের ঘোষণা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন পেনশন তহবিলের আওতায় বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য গ্র্যাচুইটির সুযোগ সৃষ্টি—এসব পদক্ষেপও প্রমাণ করে যে সরকার সামাজিক নিরাপত্তাকে ব্যয় নয়, বরং সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বস্তুত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, স্বাস্থ্য খাতে শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে এবারের বাজেটের কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন আয়, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার চাপ কমানোর একটি সুস্পষ্ট চেষ্টা এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে এটা সত্য যে, এই বাজেট বাংলাদেশের সব সমস্যার জাদুকরী সমাধান দেবে না। মূল্যস্ফীতি রাতারাতি উধাও হবে না, বেকারত্বও একদিনে দূর হবে না। বাজারে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সংস্কৃতি কিংবা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও শুধুমাত্র একটি বাজেট দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য—রাষ্ট্র কোন শ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়, সেই রাজনৈতিক বার্তাটি এবারের বাজেটে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বহু বছর ধরে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ উন্নয়নের গল্প শুনেছে, কিন্তু উন্নয়নের সুফল কতটা পেয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তারা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দেখেছে, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের উদ্বোধন দেখেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দেখে হতাশ হয়েছে, হাসপাতালের বিল হাতে নিয়ে অসহায় বোধ করেছে। সেই বাস্তবতায় এবারের বাজেট অন্তত তাদের উদ্দেশে একটি আশার বার্তা দিয়েছে।
অবশ্যই এই আশার মূল্য নির্ধারিত হবে বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে। কারণ জনগণ এখন আর কেবল ঘোষণা শুনতে চায় না, তারা ফলাফল দেখতে চায়। তারা চায় করছাড়ের সুবিধা বাজারে পৌঁছাক, ওষুধের দাম কমুক, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাক এবং মধ্যবিত্তের সংসারে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরুক। যদি সরকার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে এই বাজেট শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শুরুতেই আমি বলেছিলাম, কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ না থাকলে এই বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা বাজেট বলতে আমার কোনো দ্বিধা থাকত না। তারপরও সামগ্রিক মূল্যায়নে বলতে হয়, দীর্ঘদিন পর এমন একটি বাজেট দেখা গেল যেখানে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে মানুষের কষ্ট লাঘবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই আমার কাছে এটি নিঃসন্দেহে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সেরা বাজেট।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com