Thursday | 11 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Thursday | 11 June 2026 | Epaper
BREAKING: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের      জুনের শেষেই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন দিগন্তের আশা      একনজরে বাজেট বক্তব্য ২০২৬-২৭      আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল      বাজেটে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে ১০ অগ্রাধিকার      সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো      ৬০ ধরনের নিত্যপণ্যে কর ছাড়      

আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের সংলাপের আলোকে বাংলাদেশের সমস্যা ও সমাধানে করণীয়

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৭:৪৪ পিএম   (ভিজিট : ১৫)

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের সংলাপ দিবস পালিত হলো। এটি এমন একটি দিবস, যার উদ্দেশ্য বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করা। এই মুহূর্তে এই দিবসের উদযাপন এবং এর উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন আমাদের দেশের জন্য খুবই জরুরি। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, ঘৃণা, বৈষম্য, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং সাংস্কৃতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এই দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এত হানাহানি, লুটতরাজ, দখলবাজি আর সহিংসতা দেখিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে কোনোদিন অস্ত্র দেখিনি। গ্রামে থাকতাম বলে পুলিশও খুব একটা চোখে পড়ত না। মানুষের মধ্যে এত সম্প্রীতি ছিল—হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই যেন ভাই-ভাই ছিলাম। কাউকে অসম্মান করতে কাউকে দেখিনি। কেউ কাউকে কোপ দিয়েছে, এমন কথাও শুনিনি। কিছু ছ্যাঁচড়া চোর দেখেছিলাম; জানালা দিয়ে লাঠি ঢুকিয়ে কাপড়চোপড় চুরি করতে আসত। ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করলে তারাও দৌড়ে পালাত, কোনোদিন দা নিয়ে কাউকে মারতে আসেনি। অভাব ছিল না, তা নয়; তবে মানুষের চাহিদা খুবই কম ছিল। মানুষ ছিল সহনশীল, সামান্য বিষয়ে রেগে উঠত না। সিনেমায় কিছু পুলিশের হাতে অস্ত্র দেখেছিলাম, কিন্তু তা চলচ্চিত্রেই; বাস্তবে নয়।

এখন সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে জনতার হাতে কত অস্ত্র দেখি। ফেসবুকে, এমনকি পথে হাঁটতেও মদ, সন্ত্রাস ও সহিংসতার নানা দৃশ্য চোখে পড়ে। পুলিশের হাতেও কিছু অস্ত্র দেখি। আজকাল আবার শোনা যায়, পুলিশের অনেক অস্ত্রও নাকি লুট হয়ে গেছে।

উপজেলা সরকারি কোয়ার্টারে আমরা বড় হয়েছি। সকল কর্মচারী ও কর্মকর্তার সন্তানরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। কেউ কাউকে ঘৃণা শেখায়নি। মা-বাবা কখনো বলেননি, “এর সঙ্গে মেলামেশা করিস না” বা “ওর সঙ্গে মিশিস না”। প্রতিদিন বিকেলে মাঠে সব অফিসারের শিশুরা আসত, তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম। আমার একটি ছোট নাটকের দল ছিল। সেখানে রিহার্সাল করতাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম প্রতি সপ্তাহে একবার। সপ্তাহজুড়ে বাচ্চারা কবিতা শিখে আসত, গল্প শিখে আসত, ফরাসি খেয়ে আসত, আর আমাদের সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করত। সিইও সাহেব, ইউএনও, বড় কর্মকর্তা বা ছোট কর্মকর্তার সন্তান—এমন কোনো বিভেদ ছিল না।

ক্যারাম খেলার প্রতিযোগিতা হতো বড়দের মধ্যে। কিন্তু আমি এত ভালো ক্যারাম খেলতাম যে বড়দের মধ্যে আমিই একমাত্র শিশু ছিলাম, যে প্রতিযোগিতায় আমার বাবার জুটিতে পার্টনার হয়ে ক্যারাম খেলে পুরস্কার জিতেছিলাম। আমার মা কখনোই বলেননি যে, “তুই বড়দের সঙ্গে ক্যারাম খেলতে যাস না, ওরা সব খেলোয়াড় ছেলে, তুই একমাত্র মেয়ে।” বাবা আমার খেলার পার্টনার ছিলেন বলে হয়তো নিরাপদ বোধ করেছিলেন, তাই এতগুলো পুরুষের মধ্যে একমাত্র মেয়ে হিসেবে আমাকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দিয়েছিলেন।

আমরা আজকের যুবক আর শিশুদের মধ্যে সেই একাত্মতা কি দেখতে পাই? সেই সহনশীলতা কি দেখতে পাই? তাদের নিরাপত্তার এত অভাব যে আশেপাশের কাউকেই আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। কখন কার কুনজরে পড়ে যায়, আর আমাদের শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়ে যায়—এই ভয় আমাদের সব সময় তাড়া করে ফেরে।

একেবারেই বাস্তব কথা হলো, আজকের বিশ্বে নানা কারণে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এর একটি বড় কারণ হলো ধর্মব্যবসায়ীরা নানা উপায়ে বিভেদ সৃষ্টি করে মানুষকে একে অপরের শত্রু বানিয়ে ফেলছে। পরিবার থেকেই এই বিভেদগুলো শিশুদের শেখানো হচ্ছে। এ দেশে এখন পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসলে সাম্যের কথা শেখানো হয় না, সম্প্রীতির কথা শেখানো হয় না, সকল ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয় না। সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম—সব মানুষকেই সম্মান করার কথা বলা হয় না।

আমার বাবা এগুলো শেখাতেন। কিন্তু আজকাল এগুলো শেখানো হচ্ছে না বলেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদ, নারীর প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন, দুর্বলের প্রতি নির্যাতন করে সম্পদ হরণ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক বৈষম্য অনেক সময় সংঘাত ও সহিংসতার জন্ম দেয়।

এসব সমস্যার সমাধানে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বোঝাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। পারিবারিকভাবে তো এসব মূল্যবোধ শেখাতেই হবে। এছাড়াও যাদের মধ্যে ইতোমধ্যে বিভেদ ও সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে, সে ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সভ্যতাসমূহের সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে। এই সংলাপের মাধ্যমে মানুষ একে অপরের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতাকে জানার সুযোগ পাবে, ভুল ধারণা দূর হবে এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের সংলাপের চেতনা বাস্তবায়ন আজ সময়ের দাবি।

যদিও অনেকেই বলে থাকেন, জাতিসংঘ একপেশে মতামত দিয়ে থাকে এবং পশ্চিমাদের সব সময় সমর্থন করে কথা বলে। তারপরও তারা কিছু কিছু উদ্যোগ নিয়ে থাকে, যেগুলো বিশ্বমানবতার মঙ্গলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের প্রকৃত উদ্বেগগুলো যদি সততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার রক্ষায় তা অনেকটাই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। হয়তো তারা ভবিষ্যতে মানবাধিকারের বিষয়টিকে আরও জোরদার করবেন।

জাতিসংঘের উদ্যোগে এই দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষে মানুষে সংলাপ বৃদ্ধি করা, ভুল বোঝাবুঝি দূর করা এবং বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন তৈরি করা। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতা মানবজাতির ইতিহাস, জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই কোনো সভ্যতাকে ছোট বা বড় হিসেবে না দেখে পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন করাই এই দিবসের মূল বার্তা।

এই দিবসটির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সহনশীলতার অভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সভ্যতাসমূহের সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে, যা সমাজে শান্তি ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। এতে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি সম্মানবোধ বৃদ্ধি পায়, ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর হয়, উগ্রবাদ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি হয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব শক্তিশালী হয় এবং মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসার ঘটে।

বাংলাদেশ একটি বহুসাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের দেশ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ যুগ যুগ ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—এই চেতনাকে বুকে ধারণ করে পারস্পরিক সম্প্রীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের সংলাপ দিবসের মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের এখনই এই আদর্শের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করা উচিত, কারণ সমাজ সংশোধনের জন্য এটিই সবচেয়ে উপযোগী পথ।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের শেখায় যে বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য নিহিত রয়েছে। তাই এই দিবসটি আমাদের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা আসলে সভ্য হতে চাই; লাঠিসোঁটা ও রামদা নিয়ে ভিমরুলের চাকের মতো রাস্তায় ছুটে চলতে চাই না, যা আমাদেরকে বিশ্বের বুকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করায়। এভাবে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আক্রমণাত্মকভাবে ছুটে গিয়ে মানুষের মধ্যে ইসলামভীতি (ইসলামোফোবিয়া) তৈরি করে দেওয়া আমাদের জন্য মোটেও কল্যাণকর হবে না।

আমরা অবশ্যই প্রতিবাদ করব এবং সরকারের কাছে আমাদের দাবি-দাওয়া জানাব; তবে তা প্ল্যাকার্ড হাতে, অস্ত্র বা লাঠিসোঁটা হাতে নয়। এই ইসলামভীতি সৃষ্টির কারণে আমাদের দেশে বিনিয়োগ কমতে পারে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ব্যাহত হতে পারে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেতে পারে। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দেশে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আগমনও কমে যেতে পারে। বিদেশে চাকরির সুযোগ, ভ্রমণ এবং ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আমরা বিশ্বের কাছে উগ্র বা জঙ্গি জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। এতে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব দেশকে সংকটের মুখেও ঠেলে দিতে পারে।

এই কারণে এই মুহূর্তে আমাদের আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা দরকার। সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি ও নাট্য প্রদর্শনী, শান্তি-সম্প্রীতি ও সহনশীলতা বিষয়ক কর্মশালা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যুবসমাজকে সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পড়াশোনার পাশাপাশি শিশু, কিশোর ও যুবসমাজের মস্তিষ্ককে সৃজনশীল ও ইতিবাচক কাজে নিয়োজিত করে তাদের ব্যস্ত রাখা জরুরি। একটি মানবিক জাতি গঠনে যে তথ্য ও উপাত্ত একটি শিশু ও যুবকের জীবনমানকে শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে সরকারের পর্যাপ্ত পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। যত বইয়ের মধ্যে সিলেবাস রয়েছে, আপনারা ঘেঁটে দেখতে পারেন। সেখানে সভ্যতা শেখানো হয়নি, নারী ও মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা যথেষ্টভাবে দেওয়া হয়নি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শনের বিষয়টিও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।

যদি এসব শিক্ষা না দেওয়া হয়, তাহলে অসভ্যতা, বর্বরতা ও উগ্র আচরণ একটি যুবসমাজ বা শিশুর মধ্যে গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা কি চাই উগ্রতা ও বিভাজনে দেশটাকে ভরে দিতে? জনে জনে বিভেদ তৈরি করে একে অপরের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে চাই? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত শঙ্কিত থাকতে হবে? এখন এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

আমার মতে, আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্ত এখনই। আমাদের সন্তানদের কী শেখাবো—এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সকল বই পরিবর্তন করে দক্ষতা, সভ্যতা ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে। সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করে একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য যা যা করণীয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সময় এসেছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ গঠন একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়। এটি না হলে পুরো জাতি ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। নৈতিকতা বলতে মানুষের মধ্যে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। বিজ্ঞানভিত্তিক ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানবসম্পদের মধ্যে আদব-কায়দা ও ইতিবাচক আচরণ শেখানোর সময় এসেছে।

বর্তমানে এত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও পুনর্বিবেচনার দরকার রয়েছে, যদি সেখানে আধুনিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পড়ানো না হয়। যেসব বিষয় যুগোপযোগী নয়, সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। যুগের সঙ্গে তাল মিলাতে না পারলে সেই শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কতটুকু—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পাশাপাশি সভ্যতা শেখানো ও নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার শিক্ষা।

ধর্মীয় শিক্ষার নামে যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, নির্যাতন বা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে, সেসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার প্রয়োজন। মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা শিক্ষার সুযোগ থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ পায়।

ভোকেশনাল ট্রেনিং অবশ্যই থাকতে হবে। পাশাপাশি আদব-কায়দা, ইতিবাচক আচরণ, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখাতে হবে। নারীদেরকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে না দেখে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে হবে এবং সহনশীল আচরণের চর্চা গড়ে তুলতে হবে।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, পরিবারেও এসব মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। কীভাবে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা যায় এবং নারীর প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠা করা যায়—সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সরকারি সহায়তায় এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে যুক্ত করা যেতে পারে।

আমরা শিক্ষক, মা-বাবা—আমরাই যদি অসহনশীল হয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও সন্তানদের প্রতি উগ্র আচরণ করি এবং নির্যাতন করি, তাহলে তারা সেই আচরণই শিখবে। তাই আগে নিজেকে সহনশীল করতে হবে, আগে নিজে ভালো হতে হবে—তারপর সন্তান ও যুবসমাজকে ভালো হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

উপরের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করলে একটি আদর্শ সমাজ গঠনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশ গড়া সম্ভব। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবে, বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, ট্যুরিজম বৃদ্ধি পাবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে এবং দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে।

এর জন্য আমাদেরকে জাতি হিসেবে পৃথিবীর কাছে নিজেদের একটি ইতিবাচক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই দিবসটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, সারা বাংলাদেশের জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। শুধু দিবস নয়, সারা বছর ধরে এই সভ্যতা, সম্প্রীতি ও মানবিকতার চর্চা জাতি গঠনের অংশ হিসেবে চালিয়ে যেতে হবে।

এর কারণ হলো, আমাদের দেশে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদ প্রতিরোধ করা জরুরি। উগ্রতা বন্ধের জন্য নোংরা রাজনৈতিক স্লোগানও বন্ধ করতে হবে। “একটা একটা অমুক ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”—এ ধরনের স্লোগান কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; এগুলো নিষিদ্ধ করা উচিত। নারীর প্রতি অবমাননাকর বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ স্লোগানও নিষিদ্ধ করতে হবে।

এ ধরনের স্লোগান যারা দেবে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যে-ই হোক না কেন। সমাজে সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়ানোর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ উগ্রতা ও সহিংসতা ছড়ালে তা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের সংলাপ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক করে গড়ে তুলতে হলে বিভেদ নয়, প্রয়োজন সংলাপ; ঘৃণা নয়, প্রয়োজন সম্মান; সংঘাত নয়, প্রয়োজন সহযোগিতা। ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে একটি শান্তিপূর্ণ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। এই দিবস সেই মানবিক ও বিশ্বজনীন চেতনাকেই শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।

এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা জরুরি। যে শিক্ষা মানুষকে বিভক্ত করে, প্রতিহিংসা তৈরি করে, উগ্রতা ও ঘৃণা ছড়ায়—সেই ধরনের শিক্ষা চিহ্নিত করে তার সংশোধন বা পরিমার্জন করা প্রয়োজন। আমরা বৈষম্য নয়, বরং মানুষকে সম্মান করতে শিখব; আদব-কায়দা ও নৈতিকতা শিখব।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের শেখায়—সহনশীলতা, মানবতা ও সম্প্রীতিই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি। আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের সংলাপ দিবস উপলক্ষে আমাদের সমাজে বিদ্যমান এবং বিশ্বব্যাপী আলোচিত সমস্যাগুলোর সমাধানে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমাদের দেশের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং উগ্রবাদ, যা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। এই সমস্যার সমাধানে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় নৈতিক শিক্ষা ও সহনশীলতার পাঠ আরও জোরদার করতে হবে। বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের নিয়ে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের আয়োজন করতে হবে এবং ধর্মের নামে ঘৃণা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিষয়ক ইতিবাচক প্রচারণা চালাতে হবে এবং তরুণদের জন্য শান্তি, মানবতা ও নাগরিক দায়িত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ করে সারা দেশে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্বে উগ্র বা বিভাজনমূলক পরিচয়ে পরিচিত না হয়।

আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন ঘৃণা বা বৈশ্বিক ভুল ধারণার শিকার না হয়। একটি সভ্য ও মানবিক জাতি হিসেবে বিশ্বে নিজেদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা আমাদের দায়িত্ব। কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা উস্কানির মাধ্যমে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করা উচিত নয়।

সবশেষে, যারা সমাজে ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়ের নামে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং সংলাপ, শিক্ষা ও আইনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের পথকে এগিয়ে নিতে হবে।

নারী উন্নয়ন শক্তি, বিভিন্ন যুব সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে “সম্প্রীতি উৎসব”, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। যুবসমাজকে জঙ্গি ও ক্ষতিকর কার্যকলাপ থেকে দূরে রেখে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখা জরুরি। ডিবেট, বিভিন্ন ভাষা শেখার সুযোগ, আইটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে কাজ করার সুযোগ, এবং পড়াশোনার পাশাপাশি ভোকেশনাল শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে এনজিওগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যদি সরকার তাদের জন্য যথাযথ বাজেট বরাদ্দ করে।

সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়কে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সারা বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিকশিত হয় এবং মানুষ আরও সভ্য ও মানবিক হয়ে ওঠে। জাতিগত ও বর্ণগত বৈষম্য দূর করা অত্যন্ত জরুরি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হয়। তাই সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বৃদ্ধি করতে হবে এবং বৈষম্যবিরোধী আইন ও নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারোসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তুলে ধরে সাংস্কৃতিক মেলা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

যুদ্ধ, সহিংসতা, প্রতিহিংসা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে। এই সমস্যার সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, শান্তি ও সংঘাত নিরসন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং যুবসমাজকে সহিংসতা নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের শিক্ষা দিতে হবে।

দেশের মানুষকে অস্থিরতার মধ্যে রেখে অর্থনীতি ধ্বংস করার যেকোনো প্রচেষ্টা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশকে শান্ত রেখে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটন খাত বৃদ্ধির জন্য সরকারকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো “শান্তির সংস্কৃতি” বিষয়ক কর্মসূচি চালু করতে পারে। তরুণদের জন্য শান্তি ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে।

এর জন্য সরকার অবশ্যই বাজেট বৃদ্ধি করবে, যাতে সংঘাত কমিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং রেমিট্যান্স আয় বাড়ে। পাশাপাশি হাইটেক পার্ক ও শিল্পায়নের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়িয়ে বাংলাদেশে নতুন শিল্প গড়ে তুলতে হবে, যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।

অন্যথায় দেশ অর্থনৈতিক চাপে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—এটি বাস্তব উদ্বেগ। তাই আজ থেকেই সংলাপের পথে অগ্রসর হওয়া জরুরি। যে সংলাপ শান্তি আনে, রাজনৈতিক অস্থিরতা কমায়, হানাহানি ও উগ্রতা হ্রাস করে—সেই পথই গ্রহণ করতে হবে।

জঙ্গিবাদ দমনে সরকার, প্রশাসন ও জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

শরণার্থী ও অভিবাসী সংকট মোকাবেলার জন্য আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের প্রয়োজন, যেখানে আমাদের বক্তব্য সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য কার্যকরভাবে আলোচনার (negotiation) মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে। আমাদের নেতাদের এই মুহূর্তে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এতে কিছু ঝুঁকি থাকলেও, জনগণ যদি শান্তিতে ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে পারে, দুবেলা খাবার পায়, বেকারত্ব কমে এবং দারিদ্র্য দূর হয়—তাহলেই সেটি হবে একটি সফল রাষ্ট্রের পরিচয়।

আন্তর্জাতিক নানা পরিস্থিতি ও সংকটের প্রেক্ষিতে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭.৮ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.১৪ শতাংশ। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছে, যাদের মধ্যে আনুমানিক ৬.২ লাখ শিশু এবং প্রায় ৫.৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রবীণ রয়েছে।

এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য, পানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা আমাদের দেশের সীমিত সম্পদের মধ্য থেকেই পূরণ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার একটি বড় প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে। উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট দূষণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াচ্ছে, যার প্রভাব হিসেবে বরফ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বন্যা-দুর্যোগ আমাদের দেশে তীব্র আকার ধারণ করছে। ফলে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা, জলবায়ু অর্থায়ন, পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংলাপ ও সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বর্তমানে আমাদের দেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মিথ্যা তথ্য, গুজব এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিস্তার, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এটি মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে দিতে পারে এবং সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে। এর ফলে হতাশা, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব ও সামাজিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা, তথ্য যাচাই (fact-checking) সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, দায়িত্বশীল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

এছাড়া উস্কানিমূলক ও ঘৃণাসূচক স্লোগান ও বক্তব্য নিষিদ্ধ করতে হবে এবং নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা বক্তব্য প্রদানকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দেশকে এসব ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় যুবসমাজকে নিয়ে “ডিজিটাল সচেতনতা ক্যাম্পেইন” পরিচালনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে গুজব শনাক্তকরণ ও তথ্য যাচাই বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা উচিত।

অপসংস্কৃতি থেকে দেশকে বাঁচাতে সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের সরকার এবং সিভিল সোসাইটি সংস্থাগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করে, তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা (patronize) করতে হবে। আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রভাবের ফলে অনেক স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এসব সংরক্ষণে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে।

মানুষ গান গাক মন খুলে, তবে যেন সহিংসতা, মাদক বা অপরাধমূলক আচরণে না জড়ায়। গ্রামভিত্তিক সাংস্কৃতিক উৎসব, লোকসঙ্গীত প্রতিযোগিতা, বইমেলা এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের আন্তর্জাতিক সংলাপের প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কম দায়ী দেশগুলোও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনকে উৎসাহিত করতে সংলাপ ও সচেতনতা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা দরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতে নীতিনির্ধারকদের আরও সক্রিয় হতে হবে।



LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close