ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের রাজনৈতিক বয়ান, নির্বাচনী কৌশল এবং জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে বিজেপি। বিরোধী দলগুলো বারবার জোট গঠন করেও সেই আধিপত্যকে ভাঙতে পারেনি। কিন্তু ইতিহাস বলে, কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয় না সংসদ থেকে, হয় না কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের হাত ধরে; বরং তা জন্ম নেয় মানুষের ক্ষোভ, হতাশা এবং বঞ্চনার গভীর বাস্তবতা থেকে। ভারতের সাম্প্রতিক "ককরোজ জনতা পার্টি" বা সিজেপির উত্থান সেই বাস্তবতারই নতুন প্রতিফলন।
গত কয়েক সপ্তাহে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এমন এক আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে, যা প্রথমে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দ্রুতই এটি পরিণত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষের প্রতীকে। শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাব—এই সবকিছুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে জমতে আজ একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির রূপ নিতে শুরু করেছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার তরুণের সমাবেশ শুধু একটি মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির আন্দোলন নয়; এটি মূলত ভারতের যুবসমাজের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে পরীক্ষায় জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ। বহু শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও তারা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।
এই ক্ষোভকে সংগঠিত রূপ দিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী পিআর শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে। মাত্র একটি গুগল ফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দিয়ে যে আন্দোলনের শুরু, তা অল্প সময়ের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষের সমর্থন লাভ করেছে। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক এত দ্রুত গণসমর্থন পাওয়ার ঘটনা বিরল।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে প্রতীকী দিক হলো "ককরোজ" বা তেলাপোকা প্রতীক। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকেই এর জন্ম। যদিও মন্তব্যটি ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, কিন্তু বিপুল সংখ্যক বেকার তরুণ সেটিকে নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে যে শব্দটি মূলত অপমানসূচক ছিল, সেটিই পরিণত হয়েছে প্রতিবাদের প্রতীকে।
ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাসকগোষ্ঠীর অবজ্ঞাসূচক শব্দ বা প্রতীকই পরবর্তীতে আন্দোলনের শক্তিশালী পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। ভারতেও আজ তেলাপোকা সেই প্রতীকে রূপ নিয়েছে, যা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠছে।
ককরোজ জনতা পার্টির উত্থানকে শুধুমাত্র একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে ভারতের গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও ভারত আজ তরুণ বেকারত্বের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২৫ বছরের নিচের শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ এখনও কর্মসংস্থানের বাইরে। প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিলেও চাকরির সংখ্যা সেই তুলনায় নগণ্য। এর সঙ্গে যখন প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং প্রশাসনিক অনিয়ম যুক্ত হয়, তখন হতাশা ক্ষোভে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক।
নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল তরুণ ভোটারদের সমর্থন। ২০১৪ সালে তিনি যে "নতুন ভারত"-এর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও তার সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
এখানেই ককরোজ জনতা পার্টির রাজনৈতিক তাৎপর্য। দলটি এখনো নির্বাচনী রাজনীতির শক্তিশালী খেলোয়াড় নয়। তাদের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই, নেই রাজ্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক কিংবা প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব। কিন্তু তারা এমন একটি বিষয়কে সামনে এনেছে, যা ভারতের কোটি কোটি তরুণের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভয়ের সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করা। অভিজিৎ দিপকের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ। তিনি বলেছেন, "কতদিন আমরা জেলের ভয়ে মুখ বুজে থাকব?" এই প্রশ্নটি কেবল তার ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়; এটি বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন।
সমালোচকদের মতে, গত এক দশকে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে দুর্বল হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের পরিসর এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও বিজেপি সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে, তবুও তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসও এই পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বড় রাজনৈতিক আন্দোলন দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার নতুন প্রজন্মকে দ্রুত সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রবণতাও বেড়েছে।
ভারতে ককরোজ জনতা পার্টি সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রবণতারই অংশ। তারা হয়তো আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো শক্তি অর্জন করবে না। কিন্তু তাদের উপস্থিতি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তারা এমন একটি প্রশ্ন তুলেছে যা মোদি সরকারের জন্য অস্বস্তিকর—দেশের যুবসমাজ কি এখনও বিজেপির সবচেয়ে বড় সমর্থক?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ককরোজ জনতা পার্টির প্রকৃত শক্তি তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতায় নয়, বরং প্রতীকী ক্ষমতায়। তারা এমন একটি ভাষা ব্যবহার করছে যা তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে মিম, ভিডিও, এআই-নির্ভর প্রচারণা এবং ডিজিটাল সংস্কৃতিকে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে তাদের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে এই আন্দোলনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইতিহাস দেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ক্ষোভকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সহজ নয়। আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচি। শুধুমাত্র প্রতিবাদ দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা যায় না।
তবুও ককরোজ জনতা পার্টির উত্থান ভারতের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, মানুষের বাস্তব সমস্যাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যখন মনে করে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন তারা নতুন বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।
মোদি সরকারের জন্য এটি হয়তো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংকট নয়। কিন্তু এটি একটি সতর্কবার্তা। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে এমন সব আন্দোলন থেকে, যেগুলোকে শুরুতে গুরুত্বহীন বলে মনে করা হয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের রাজনীতিতে ককরোজ জনতা পার্টির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তারা আদৌ একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে, নাকি কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী ডিজিটাল আন্দোলন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে—সেটিও এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই আন্দোলন ইতোমধ্যেই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা তরুণদের ক্ষোভ, বেকারত্বের হতাশা, শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম এবং জবাবদিহিতাহীনতার বিরুদ্ধে যে অসন্তোষ নীরবে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, ককরোজরা সেটিকেই উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করেছে। বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি কিংবা নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনো নিঃসন্দেহে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী; কিন্তু ইতিহাস বলে, যখন তরুণ প্রজন্ম কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন পরিবর্তনের বীজ অঙ্কুরিত হতে বেশি সময় লাগে না। সেই অর্থে ককরোজদের উত্থান হয়তো আজ কোনো নির্বাচনী বিপ্লব নয়, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক সতর্কসংকেত—যা নরেন্দ্র মোদির কপালে কার্যত নতুন ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com