ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
জাতিসংঘের নেতৃত্বে বাংলাদেশ: অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সাফল্য
✎ আহসান হাবিব বরুন
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৯:০১ পিএম
X
Advertisement

একসময় আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে বাংলাদেশকে দেখা হতো মূলত উন্নয়ন-সহায়তানির্ভর একটি রাষ্ট্র হিসেবে। জলবায়ু ঝুঁকি, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা মানবিক সংকটের আলোচনায় বাংলাদেশ ছিল একটি “কেস স্টাডি”। কিন্তু সময় বদলেছে। বিশ্ব রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন আর কেবল আলোচনার বিষয় নয়; বরং আলোচনার অংশীদার। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহ, শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘ অবদান, জলবায়ু কূটনীতিতে সক্রিয়তা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বিজয়। এটি কেবল একটি নির্বাচন জয়ের ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক আস্থার এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে ৮ ভোটে পরাজিত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। মোট ১৯০টি ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৯৯ ভোট, আর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৯১ ভোট। গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন বিশ্ব কূটনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের জন্যও তেমনি ঐতিহাসিক।

কারণ ৪০ বছর পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি। ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। দীর্ঘ চার দশক পর আবারও বাংলাদেশের হাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নেতৃত্ব ফিরে আসা নিঃসন্দেহে দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।

এই বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, সেটি বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। তিনি বলেছেন, এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন। একইসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, খলিলুর রহমান সংযোগ, সংলাপ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

বাস্তবতা হলো, এই বিজয় হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রস্তুতি, কৌশলগত যোগাযোগ এবং বর্তমান সরকারের বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সক্রিয়তা। বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও খলিলুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয় মাত্র কয়েক মাস আগে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সাল থেকেই ধারাবাহিক প্রচার চালিয়ে আসছিল। তার পরও বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে।


কারণ বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। “রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট” বা পারস্পরিক সমর্থনভিত্তিক কূটনৈতিক সমঝোতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়েছে বাংলাদেশ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ফোরামে সক্রিয় প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন করেছে। এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং দক্ষ, হিসাবি এবং কৌশলগত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিফলন।

এখানেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক নীতির বিশেষত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সরকার “নিষ্ক্রিয় কূটনীতি” থেকে বেরিয়ে এসে “উদ্যোগী কূটনীতি”র পথ বেছে নিয়েছে। আজ বাংলাদেশ কেবল আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানায় না; বরং আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরে, অংশীদারিত্ব তৈরি করে এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাও এই বিজয়ের বড় শক্তি। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি নন; বরং জাতিসংঘ ব্যবস্থার গভীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাদার কূটনীতিক। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় তিনি জেনেভা ও নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯১ সালে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রায় ২৫ বছর তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক নীতি, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক প্রশাসন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন।

আমি মনে করি, এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা, আস্থা ও ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

আর এই আস্থা কেবল পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খলিলুর রহমানের বিজয়ের পর চীন, ভারত ও পাকিস্তান—দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছে। চীনের দূতাবাস বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

কারণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত মহাসাগরীয় কৌশলগত প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছোট ও মধ্যম আকারের রাষ্ট্রগুলোর জন্য স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশ সেই কঠিন কাজটিই করার চেষ্টা করছে।

বর্তমান সরকার একদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করছে। একইসঙ্গে ভারত, মুসলিম বিশ্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা চলছে। এই বহুমাত্রিক কূটনীতিই আজ বাংলাদেশের শক্তি।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্রিয়তা শুধু রাজনৈতিক নয়; মানবিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অবদান ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। একইভাবে রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক ভূমিকার কারণেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

জলবায়ু কূটনীতিতেও বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। উন্নয়নশীল বিশ্বের পক্ষে জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষতিপূরণ ও প্রযুক্তি সহায়তার প্রশ্নে বাংলাদেশ দৃঢ় অবস্থান নিয়ে চলেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের বক্তব্য এখন গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়। কারণ বাংলাদেশ কেবল নিজের স্বার্থের কথা বলে না; বরং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা কোটি মানুষের পক্ষে কথা বলে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের “সফট পাওয়ার”। একসময় বাংলাদেশকে শুধু শ্রমশক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে দেখা হতো। এখন বাংলাদেশকে দেখা হচ্ছে শান্তিরক্ষী, মানবিক সহযোগী, উন্নয়ন অংশীদার এবং দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিক রাষ্ট্র হিসেবে। এই ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সাফল্যের মধ্যেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। কূটনৈতিক অর্জন ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, পেশাদার পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতীয় ঐক্য। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী হলো কেবল জাতীয় স্বার্থ।

বর্তমান সরকার সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই কূটনৈতিক সম্পর্ককে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের বিজয় সেই প্রচেষ্টারই বড় স্বীকৃতি।

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। আর ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। সেই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।

আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আর নীরব দর্শক নয়; বরং ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে একটি আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। আর এই পরিবর্তনের পেছনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সক্রিয় কূটনৈতিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘের করিডোরে বাংলাদেশের এই নতুন পদচারণা শুধু একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের পুনর্জাগরণ। এটি প্রমাণ করে, সঠিক নেতৃত্ব, কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশ শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement