মেঘনা নদীর তীরে গড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার মেঘনা বীচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত এই পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ক্ষুব্ধ পর্যটক ও স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দোকান বরাদ্দ, যানবাহন পার্কিং, অস্থায়ী ব্যবসা এবং নৌযান পরিচালনাসহ বিভিন্ন খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের কারণে নতুন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনায় নানা বাধা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে আলেকজান্ডার মেঘনা বীচে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, মেঘনায় ইলিশ শিকারের দৃশ্য এবং নদীসংলগ্ন চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণকারীরা ছুটে আসছেন। অনেকেই স্পিডবোট, ট্রলার ও নৌকায় চড়ে নদী ভ্রমণে অংশ নিচ্ছেন।
তবে পর্যটকদের অভিযোগ, নদী ভ্রমণ, খাবার, পানীয় ও অন্যান্য সেবার জন্য নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পার্কিং ফি ও নৌযান ভাড়াও অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৯ মে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কয়েকশ পর্যটককে নিয়ে মেঘনার মাঝখানে আবদুল্লাহ চর এলাকায় যায় কয়েকটি লঞ্চ ও ট্রলার। পরে দমকা হাওয়ার কারণে তারা সেখানে আটকা পড়েন। পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের যৌথ অভিযানে গভীর রাতে তাদের উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া ৩০ মে সন্ধ্যায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে পর্যটকদের সঙ্গে লঞ্চ স্টাফদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন পর্যটক আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নারী পর্যটকদের হয়রানি, বখাটেদের উৎপাত এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থীরা।
নোয়াখালীর আন্ডারচর এলাকা থেকে ঘুরতে আসা মো. রুবেল বলেন, “জায়গাটি সুন্দর হলেও এখানে পর্যটকদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয় না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং দুর্ব্যবহারের কারণে অনেকেই দ্বিতীয়বার আসতে চাইবেন না।”
পর্যটক রেদওয়ান হোসেন ইমরান বলেন, “এখানে কয়েকটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। নদীর পাড়ে কিছু অসাধু চক্রের প্রভাব দেখা যায়।”
নাছিমা বেগম নামে এক দর্শনার্থী বলেন, “প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। অল্প সময় নৌভ্রমণের জন্যও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির প্রভাবের কারণে স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেটের বাইরে ব্যবসা করতে গেলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, “দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অসদাচরণের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা বলেন, “ঈদ উপলক্ষে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রকে আরও পর্যটকবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তা, সেবার মান উন্নয়ন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র ভবিষ্যতে দর্শনার্থী হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এসআর