Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      মিয়ানমারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৫৫      

একটি আম গাছ, কিছু জমি এবং দুই ভাসুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের গল্প!

প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ১১:২৭ এএম   (ভিজিট : ৪১)

ফাইল ছবি

আদালতের এজলাস কক্ষটি তখন পিনপতন নীরব। আদালতে বিচারপ্রার্থী চল্লিশোর্ধ রানু কবীর। সঙ্গে তার ষোড়শী মেয়ে হ্যাপী। আসামিদ্বয় লিয়াকত ও মান্নান কম্পমান অবস্থায় দুই হাত জোড়া করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। 

অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারা। ধর্ষণের এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এ ধারার বলা হয়েছে যে, যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সাথে তার সন্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শণ বা প্রতারণামূলক ভাবে তার সন্মতি আদায় করে অথবা ষোল বছরের কম বয়সের কোন নারীর সাথে তার সন্মতিসহ বা সন্মকি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।

নালিশী আরজি থেকে জানা যায়, রানু কবির তাঁর মেয়ে হ্যাপীকে নিয়ে বসবাস করেন শ্বশুরের ভিটায়। স্বামী একজন প্রবাসী। বছরে একবার বাড়ি এসে পরিবার-পরিজনদের দেখে যান। তিনি ও তার মেয়ে ঘটনার দিন নিজ বসতঘরে অবস্থান করছিলেন। তখন বিকেল প্রায় ৩টা। আকস্মিকভাবেই তার ঘরে আগমন করল আসামিরা। কিছু বোঝার আগেই রানু কবীরকে আসামি লিয়াকত ধর্ষণ করতে শুরু করল। একই ভাবে মেয়ে হ্যাপীকে পাশের ঘরে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মান্নান। ধর্ষণ শেষে আসামিরা বীরদর্পে বেরিয়ে যায়। চিৎকার দিয়ে ডাকাডাকি করলেও পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ এগিয়ে আসেনি। কারণ আসামিরা অত্যন্ত দাঙ্গাবাজ লোক।

অভিযোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে রানু কবীর তার আঁচল দিয়ে ও মেয়ে হ্যাপী তার ওড়নায় মুখ ঢেকে অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন। এজলাস কক্ষে এক অভাবনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হলো। উপস্থিত জনগণ পারলে আসামিদের পিটুনি শুরু করে দেয়। কিন্তু এজলাস কক্ষে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার সুযোগ কারও নেই। তাই রক্ষে আর কী! আসামিরা করজোরে বিচারকের কাছে নিবেদন করল তারা দুই ভাই নির্দোষ, তারা বিচারপ্রার্থী। অভিযোগ গঠনের পর বিজ্ঞ বিচারক বিচারের দিন ধার্য করলেন। নির্ধারিত দিনে বিচার কাজ শুরু হলো। 

পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকদ্দমা বিচারের জন্য উপস্থাপন করলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ডাক পড়ল ফরিয়াদী (বাদী) রানু কবীরের। সাক্ষীর কাঁঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রানু কবীর হলফ পড়লেন ‘আমি প্রতিজ্ঞাপূর্বক বলিতেছি যে, এই মোকদ্দমায় আমি যে সাক্ষ্য দিব তা সত্য হইবে, ইহার কোনো অংশ মিথ্যা হইবে না এবং আমি কোনো কিছু গোপন করিব না।’ বিচারক লক্ষ্য করলেন রানু কবীর হলফ পড়তে গিয়ে ইতস্তত বোধ করছিলেন এবং তার গলা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছিল। সবাই উদগ্রীব নির্যাতিতা রানু কবীরের ফরিয়াদ শোনার জন্য। কিন্তু রানু কবীরের মুখে কোনো কথা নেই। প্রশ্ন জাগে, কেন এই নীরবতা। বিচারক অত্যন্ত সহানুভূতি মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন রানু কবীরকে, তাকে কেউ ভয় দেখিয়েছে কি না? তারপরও রানু কবীর নীরব। বিচারকের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, বার বার তিনি রানু কবীরকে অভয় দিতে থাকেন, আশ্বাস দিতে থাকেন তার সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তা বিধানের।

সব শেষে রানু কবীর অস্ফুট কণ্ঠে বলেন, ‘আসামিরা সব দিয়ে দিয়েছে’। বিস্মিত বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, কী দিয়ে দিয়েছে? এ সময় এগিয়ে আসেন আইনজীবী। তিনি জানান যে, পৈত্রিক সম্পত্তিতে ফরিয়াদির স্বামীর প্রাপ্য অংশ দিয়ে দিয়েছে আসামিদ্বয়। 

এবার বিচারের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান ফরিয়াদি রানু কবীরকে জিজ্ঞেস করেন আসামি তাকে ধর্ষণ করেছে কি না? প্রশ্ন শুনে লজ্জাবনত হয়ে পড়েন রানু কবীর, তিনি জবাব দেন ‘না, আমার ভাসুর লিয়াকত সজ্জন ব্যক্তি। তিনি আমার সঙ্গে কখনোই কোনো খারাপ বা অশালীন আচরণ করেননি। সম্পত্তির ভাগাভাগি ত্বরান্বিত করার জন্যই মামলা করেছিলাম। নালিশ দরখাস্তের বক্তব্য আমার নয়, ভাশুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে নালিশ দায়ের করতে আমি কাউকে কোনো নির্দেশনা দিইনি।’ 

এরপর ডাক পড়ে সাক্ষী হ্যাপীর। যথারীতি হলফ পড়ানোর পর তাকেও বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, আসামি মান্নান তাঁকে ধর্ষণ করেছে কি না? তিনিও তার মায়ের মতোই জবাব দেন। তার সঙ্গে শ্রদ্ধেয় চাচাকে জড়িয়ে ধর্ষণের যে কথা বলা হয়েছে তা জেনে তিনি যারপরনাই লজ্জিত হন। ঘটনা এরপর পরিষ্কার হয়ে যায় বিচারকের সামনে। লিয়াকত, মান্নান ও রহিম এরা তিন ভাই। তাদের এজমালি সম্পত্তিতে রয়েছে একটি বিশাল আম গাছ। ওই গাছের আম পাড়তে গিয়েছিলেন হ্যাপী। আম গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় তাকে ওই সময় আম পাড়তে নিষেধ করেন তার চাচা। এই নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। তখন রানু কবীর সিদ্ধান্ত নেন তার স্বামীর পৈর্তৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেবে। তার স্বামী এতে রাজি হননি। 

স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে, তাকে না জানিয়ে রানু কবীর এক পরিচিত ‘টাউট’ শ্রেণির লোকের শরণাপন্ন হন। সেই ব্যক্তিই জমি দ্রুত আদায় করার ‘সহজ বুদ্ধি’ হিসেবে এই ধর্ষণের নোংরা গল্প ফাঁদেন। সামান্য জমির লোভ আর ক্ষোভের বশে একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে, নিজের ও নিজের ১৬ বছরের মেয়ের সম্ভ্রমকে বন্ধক রেখে আদালতে মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন রানু কবীর।

মামলা থেকে লিয়াকত ও মান্নান সসম্মানে খালাস পেলেন বটে, কিন্তু যে মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক অবমাননা আর আদালতের বারান্দায় ঘোরার ক্লান্তি তারা সয়েছেন, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আইনের এমন অপব্যবহার আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

অথচ এ আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ৭ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ‘রক্ষাকবচ’ থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা মামলার হিড়িক কেন থামছে না? কারণ, এই ১৭ ধারার বাস্তব প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ধারাটি রীতিরকম কাগজে বাঘ, বাস্তবে ঠুঁটো জগন্নাথ। একটি মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর আদালত খুব কম ক্ষেত্রেই নিজ উদ্যোগে বাদি বা তার পেছনে থাকা কুশীলবদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। শাস্তির এই ভয়হীনতাই অপরাধপ্রবণ মানুষকে আরও সাহসী করে তুলছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রামের সাধারণ একজন নারী আইনের মারপ্যাঁচ বা আদালতের ভাষা বোঝেন না। তাহলে এই রোমহর্ষক ও কুৎসিত ধর্ষণের গল্পগুলো লেখে কারা? বাস্তবতা হলো, আদালতের আনাচে-কানাচে ও বারান্দায় ওত পেতে থাকা এক শ্রেণির অসাধু ‘টাউট’, দালাল এবং নীতিহীন মোহরা (আইনজীবী সহকারী) এমনকি কিছু আইনজীবীরাও এই নোংরা ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তারা তৈরি করে দেন একেকটি বানোয়াট ও লোমহর্ষক ‘স্ক্রিপ্ট’। জমিজমা, টাকা-পয়সা বা ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর জন্য তারা ধর্ষণের মামলাকে ‘সবচেয়ে মোক্ষম ও সহজ হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়।

সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, এই নালিশি দরখাস্ত বা আরজিগুলো অত্যন্ত অশালীন, কুরুচিপূর্ণ এবং চটকদার ভাষায় লেখা হয়, যা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে পড়া অসম্ভব। অনেক সময় বাদি নিজে সম্পূর্ণ না বুঝেই শুধু অপরপক্ষকে দ্রুত জেলে ঢোকানো বা ঘায়েল করার জন্য সেই নোংরা কাগজে টিপসই বা স্বাক্ষর দিয়ে দেন।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।
Email: seraj.pramanik@gmail.com

এমএ


সম্পর্কিত   বিষয়:  আম গাছ  


LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close