প্রেম এক দুর্নিবার আকর্ষণ। হতে পারে তা ভোরের লাল সূর্যের উজ্জ্বল সোনালি আভায় মন-প্রাণ ভরে ডুবে থাকা; কিংবা গোধূলির খয়েরি রঙে বিষাদ মনে পশ্চিমাকাশের সাথে মিতালি করে দুঃখ ভোলা; আবার এমনও হয়- গভীর রাতে অন্ধকারে বিরাট মাঠে নিমগ্ন তাকিয়ে তারার মেলার সাথে একাত্ম হওয়া; বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে সকাল দুপুর সন্ধ্যাবেলা আত্মার সাথে আত্মার মিলনে ভাগ করে নেওয়া- সমস্ত দুঃখ-কষ্ট উড়িয়ে দিয়ে খৈ ফোটার আনন্দে মেতে থাকা; অথবা আকর্ষণের মৌলনীতি- বিপরীত ধর্মের সত্তার জন্য অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর গোনা; মেঘ আর বাতাসের তরঙ্গ সিগন্যালে সাড়া দিয়ে পতঙ্গদের মতো আগুনে ঝাঁপ দেওয়া। প্রেম কি তবে চিত্তের ব্যধি, না কি হর্ষোল্লাসে প্রকাশিত অস্তিত্বের সুস্থ-সুন্দর বিন্যাস সমাবেশ?
প্রেমের উৎস নিজের মন, অথবা অন্যের মন যাকে আরাধ্য ধরে নিয়ে আবর্তিত হয় জীবন। জীবনচক্র পূর্ণতা লাভ করলে মরে যায় প্রেম। কুঁড়ি পাতার লাজুক সবুজ রং মাথা নুয়ে থাকে, থাকে বুঁদ হয়ে- জীবনকে ফিরিয়ে দেবে অন্য জীবনে। ভক্তির প্রবল স্রোত ধারা আবেগের সাথে মিলেমিশে একাত্ম হয়ে উঠে- গেয়ে যায় যৌবনের গান। যৌবনই কী তবে সকল প্রেমের, সমস্ত সৌন্দর্যের আধার? যদি তা-ই হয়, যৌবনকে লালন-পালন করার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মৃত্যুহীন জীবন। মৃত্যুহীন জীবন কি তবে আলোকিত করে সবাইকে? তা কি আদৌ সম্ভব? হতে পরে এবং তা সম্ভবত্ত বটে।
আমাদের যাপিত জীবনের ছিটেফোঁটা গল্পগুলো বাদ দিলে তা হয়ে ওঠে জ্যোতির্ময় পথে যাত্রা, কাল নিরবধি। মৃত্যু না থাকলে বোঝা যায় না জীবনের সৌন্দর্য সুধা। মৃত্যু জীবনপথের শেষ সীমানাও কিন্তু নয়; প্রকৃত অর্থে প্রেমের শুরু হয় নাশ থেকেই। স্থবিরতার বিপরীতে লক্ষ লক্ষ তারাদের ছোটাছুটি হচ্ছে প্রকৃত প্রেমপ্রবাহ। ব্যক্তিগত অনুভবে পরিপুষ্ট হলেও প্রেম আশ্রয় খুঁজে পরিশুদ্ধ আত্মায় তথা ঐশ্বরিক চেতনায়।
প্রেমের কেন্দ্রে থাকে শক্তি- সূর্যের মতো। এর প্রকাশ ঘটে ভোরের নরম আলোর লাল আভায়, ফুলের প্রস্ফুটিত হাসিতে। বিষাদ বিকেলের প্রান্তেও মেটে রং আভা দিগন্তবিস্তৃত নরম আনুভূমিক রশ্মি জাগিয়ে রাখে আশার আলো- আরেকটি সকাল; অথবা প্রেমের দুর্নিবার উষ্ণ শক্তি সূর্য চন্দ্রের পিঠে সওয়ার হয়ে পৃথিবীকে বোলায় স্নিগ্ধ নরম আলোর পরশ, প্রকাশ করে প্রেমের অনুপম সৌন্দর্য সুখ। মানুষের মনেই বসবাস করে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ- নক্ষত্রের শক্তি এবং প্রেমলীলা। নামহীন অবয়বহীন এ প্রেম কখনো চলে না সরল পথে। প্রেমের জাত ধর্মই হলো বন্ধুর পথে চলা, ঝোড়ো হাওয়ায় নৌকা ভাসানো, স্রোতের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামে মেতে থাকা।
প্রেমের পথে নিরন্তর এ সংগ্রাম সমভাবে প্রযোজ্য ব্যক্তিপ্রেম এবং দেশপ্রেম উভয় ক্ষেত্রেই। সংগ্রামের এ পথ প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়েই রূপ নেয় নিরস্ত্র কিংবা সশস্ত্র যুদ্ধে। ব্যক্তিগত প্রেম কিংবা ঐশ্বরিক প্রেমের যুদ্ধ থাকে অদৃশ্য- শুধুই প্রকাশ হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। যুদ্ধশেষে সমর্পণে স্বস্তিলাভ কিংবা শান্ত সরোবরে ঝিরঝির হাওয়ার মৃদু কম্পনে শিহরণ অনুভূতি।
দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-চরিত্র পুরোটাই ভিন্ন। ব্যক্তির সমষ্টি হলো দেশ, দেশপ্রেমও তাই চরিত্রগত ভাবে সামষ্টিক। ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের মিলের অংশটুকুই প্রকাশ পায় দেশপ্রেমে। ব্যক্তিগত বিভেদ দ্বন্দ্ব যত কম দেশপ্রেম ততবেশী শক্তিশালী। বিভেদের পরিমাণগত এবং গুণগত বৈশিষ্ট্য আবার নির্ভর করে বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর শক্তিমত্তা, আক্রোশ আক্রমণের তীব্রতার ওপর। এক দেশ বা গোষ্ঠী যখন স্বীকার করে না অন্য দেশ বা গোষ্ঠীর স্বাভাবিক অধিকার, মেনে নেয় না মর্যাদার অস্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ তখন হয়ে ওঠে অপরিহার্য। মুক্তিযুদ্ধ স্বাভাবিক ভাবেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ; অত্যাচারের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ প্রতিরোধ। আমরা জানি বস্তুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস, বস্তুর বিকাশও ঘটে শক্তির দ্বান্দ্বিক ঘাত-অভিঘাতের প্রক্রিয়ায়। বিকাশের পুরো প্রক্রিয়ায় শক্তি জোগায় কিংবা প্রভাব বিস্তার করে- সঠিক পথে, অবশ্যই মুক্তির পথে পরিচালিত করে নিউক্লিয়াসে বিরাজমান ঐশ্বরিক শক্তি। কোনো দেশের কিংবা জাতি- গোষ্ঠীর মুক্তির সংগ্রামের সাফল্য ব্যর্থতা নির্ভর করে ওই নিউক্লিয়াসে অবস্থিত শক্তির প্রবল ইচ্ছা তথা দৃঢ় মনোবল এবং ব্যক্তি সমষ্টির বিভেদ ঘুচানোর ঐন্দ্রজালিক সাফল্যের ওপর। ব্যক্তি খুঁজে নিতে চায় তার মনের মানুষকে। অন্যের মধ্যে নিজের চিন্তা-চেতনা কর্মের মিল খুঁজে পাওয়ার পথে চলতে চলতেই গড়ে ওঠে বৃহত্তর ঐক্য। এ ঐক্য রূপ নেয় দেশপ্রেমের আকারে, সকল মানুষের মুক্তির আবাস খুঁজে পায়।
দেশপ্রেমের সাথে গাঁথা হয়ে গেলে ব্যক্তিগত প্রেমের অস্তিত্ব হয় নগণ্য। দেশ তথা সমষ্টি অস্তিত্বহীন হলে ব্যক্তি উড়ে যাবে হাওয়াই বেলুন। এ জন্য সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দেশের জন্য শামিল হয় মুক্তিযুদ্ধে। জনযুদ্ধ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ হয় না। শাসক সেনাপতির ক্যারিশমায় বা জাদুকরী শক্তিতে যুদ্ধ জয় হয় না, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি জাতিসত্তার নিউক্লিয়াস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাহসী নেতৃত্ব, দৃঢ়প্রত্যয়, সর্বপোরি গভীর দেশপ্রেমে ঐক্যবদ্ধ হয় কোটি বাঙালি। ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে রক্তের সাগরে ভেসে ওঠে স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ- ভালোবাসার প্রতীক, ত্যাগের প্রতীক, মর্যাদার প্রতীক, লাল সবুজ পতাকার অহংকার নিয়ে। তবে শেষ হয় না মুক্তির পথে সংগ্রাম- এ সংগ্রাম যে নিরন্তর ।
কবি ও প্রাবন্ধিক
(লেখকের ‘মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর’ গ্রন্থ থেকে পুনঃমুদ্রিত)।
এমএ