কল্পনা করুন, বছরের পর বছর যে রাস্তা দিয়ে আপনি ঘরে ফিরছেন, হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখলেন সেখানে প্রতিবেশীর ইটের দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে! কিংবা আপনার ঘরে আলো-বাতাস আসার একমাত্র জানালাটি পুরোপুরি আড়াল করে ঠিক পাশেই তুলে দেওয়া হলো একটি বিশাল ভবন। বুক ফেটে কান্না এলেও হুট করে হয়তো আপনি কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। ভাবছেন, জমি তো ওনার, আমি বাঁধা দেওয়ার কে?
যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তবে আপনি ভুল করছেন। আমাদের দেশের প্রচলিত আইন বলছে, অন্যের জমির ওপর দিয়ে চলাচলের বা আপনার ঘরে আলো-বাতাস পাওয়ার একটি অকাট্য আইনি অধিকার আপনার রয়েছে। আইনের ভাষায় একে বলা হয় 'ইজমেন্ট রাইট' 'সুখাধিকার'। নিজের জমি না হয়েও বছরের পর বছর ব্যবহারের ফলে এই অধিকারটি কীভাবে আপনার আইনি স্বত্বে পরিণত হয়? কত বছর কোনো বাধা ছাড়া ব্যবহার করলে এই অধিকার স্থায়ী রূপ নেয়? আর কেউ হঠাৎ এতে বাধা দিলে আইনই বা আপনাকে কীভাবে সুরক্ষা দেবে?
একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনাদের মাঝে আরও পরিস্কার হয়ে উঠবে। ধরুন, কুষ্টিয়ার রহিম সাহেব গত ২৫ বছর ধরে তার বাড়ির পেছনের একটি সরু আইল বা পথ ব্যবহার করে মেইন রোডে যাতায়াত করছেন। এই পথটি আসলে তার প্রতিবেশী করিম সাহেবের জমির অংশ। কিন্তু রহিম সাহেবের বাড়িতে ঢোকার বিকল্প কোনো সহজ রাস্তা নেই। হঠাৎ একদিন তাদের মধ্যে ঝগড়া হলো এবং করিম সাহেব সেই পথে বেড়া দিয়ে দিলেন। রহিম সাহেব কি এখন রাস্তা হারাবেন? আইন বলছে না!
যেহেতু রহিম সাহেব কোনো বাধা ছাড়াই, প্রকাশ্য ভাবে এবং টানা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই পথটি ব্যবহার করে আসছেন, তাই 'ইজমেন্ট অ্যাক্ট' বা 'সুখাধিকার আইন' অনুযায়ী তিনি এই পথের ওপর একটি স্থায়ী আইনি অধিকার লাভ করেছেন। করিম সাহেব চাইলেও এখন আর এই রাস্তা বন্ধ করতে পারবেন না। কিন্তু এই অধিকার দাবি করতে হলে রহিম সাহেবকে আদালতে কী প্রমাণ করতে হবে? আর কতদিনের মধ্যে মামলা করতে হবে? চলুন জেনে নিই বিস্তারিত।
আপনি দেওয়ানি আদালতে ‘ইজমেন্ট অধিকার’-এর দাবিতে মামলা করে আদালতের রায় বা ডিক্রিবলে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতার অপসারণ করতে পারেন। আবার দ্রুত প্রতিকার পেতে আপনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩৩ ধারা মোতাবেক গণ-উৎপাত অথবা পাবলিক নুইসেন্স অপসারণের লক্ষ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগপত্র দায়ের করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ ধরনের অসুবিধা দূর করা সম্ভব। আমাদের ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ২৬ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি শান্তিপূর্ণভাবে এবং প্রকাশ্য ভাবে কোনো ব্যক্তির ভূ-সম্পত্তি বাঁধাহীন ভাবে ও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ২০ বৎসর কাল ধরে ভোগ দখল করে থাকলে তাতে তার পথ চলার অধিকারজনিত স্বত্ব অর্জিত হয়। অনেকে চলাচলের পথকে দলিল করে দেয়। শুধু পথের অধিকার নয়, দালান কোটা নির্মাণেও বিল্ডিং কোড মেনে প্রতিবেশীর সুখাধিকার বিষয় বিবেচনা করতে হবে। শুধু তাই নয়, পানির কোনো উৎস থেকে পানি পাওয়ার অধিকার, আলো ও বাতাস পাওয়ার অধিকার, জলাধার বা পুকুরের পানি ব্যবহারের অধিকারও সুখাধিকারের মধ্যে পড়ে। এ সুখাধিকার ভোগে অন্যের জমি ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকারও আপনার রয়েছে।
আপনি আপনার সুখ বা সুবিধার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে সুবিধা আদায়ের প্রতিকারের পাশাপাশি আপনি নিষেধাজ্ঞাও চাইতে পারেন। তবে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শট-কাট যাতায়াতের অজুহাতে ইজমেন্ট রাইট এর দাবি করা যাবে না। সেই সাথে সদ্য জমি ক্রেতা তার জমির পাশে পথের অধিকার দাবিতে মোকদ্দমা করলে পরাজিত হবে।
তবে পথাধিকার প্রমাণ করতে হলে, যে বিষয়গুলো প্রমাণ করতে হবে সেগুলো হলো- ১. তারা দীঘির্দন ধরে এই অধিকারগুলো শান্তিপূর্ণ ভাবে, উন্মুক্ত ভাবে ব্যবহার করে আসছেন, ২. তারা অধিকার হিসেবেই এগুলো উপভোগ করে আসছেন এবং তাদের এই উপভোগে মালিক কতৃর্ক কোনো বাঁধা দেয়া হয়নি, ৩. তারা এই অধিকারগুলো সরকারি জমির ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উপভোগ করে আসছেন, ৪. বিশ বছর বা বারো বছর এভাবে সুখাধিকার উপভোগ করার পর পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সুখাধিকার দাবি করতে হবে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।
ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com
এমএ