একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নকে শুধু সড়ক, সেতু কিংবা উঁচু অট্টালিকার মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো জনগণের জন্য নিশ্চিত স্বাস্থ্যসেবা। কারণ একজন অসুস্থ মানুষ কখনোই উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন না। সে বিবেচনায় দেশের ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী, জনকল্যাণমুখী এবং দূরদর্শী উদ্যোগ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেনের এই ঘোষণা দেশের স্বাস্থ্যখাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায় এমন একটি বৃহৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সরকার জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কোনো সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত খাতে মনোযোগ দেয়, তখন সেটি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং কল্যাণমুখী রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য একটি বড় বাস্তবতা। রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে তুলনামূলকভাবে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও উপজেলার সাধারণ মানুষকে প্রায়ই উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা বা রাজধানীমুখী হতে হয়। এতে রোগী ও তার পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে রোগ জটিল আকারও ধারণ করে। এই বাস্তবতায় উপজেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা শয্যাসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। অনেক সময় একটি বেডে একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হয়। ফলে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শয্যাসংখ্যা দ্বিগুণ করা হলে এই চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং রোগীরা আরও উন্নত পরিবেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
এখানে শুধু শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি নয়, বরং এর সঙ্গে স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সামগ্রিক উন্নয়নের একটি বার্তাও রয়েছে। সাধারণত শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর অর্থ হচ্ছে হাসপাতালের ভবন সম্প্রসারণ, নতুন ওয়ার্ড স্থাপন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। ফলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীই একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি। অসুস্থতা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং পরিবারকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে। অন্যদিকে সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা মানুষকে নিরাপত্তা দেয়, কর্মক্ষম রাখে এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাই স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়কে শুধু সরকারি খরচ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মূলত দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য উপজেলা হাসপাতালই চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল। তাদের অনেকের পক্ষে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। ফলে উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি মানে হলো সরাসরি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি। এই সিদ্ধান্তের সুফল সবচেয়ে বেশি ভোগ করবেন সেইসব মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে আসছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় সরকারের একটি মানবিক চেহারাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যসেবা সেই মৌলিক অধিকারের অন্যতম। সরকার যখন চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণে বড় ধরনের বিনিয়োগের অঙ্গীকার করে, তখন তা কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় থাকে না; বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়।
বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। তাই উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি ভবিষ্যতের যেকোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সরকারের এই উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। কারণ মানুষ দেখতে চায় তাদের করের অর্থ এবং রাষ্ট্রের সম্পদ এমন খাতে ব্যয় হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনা সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে যে সরকার উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকেই রাখতে চায়।
সব মিলিয়ে ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দেশের কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে এবং গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের জন্য একটি অধিকতর মানবিক, আধুনিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠবে। জনগণের কল্যাণে সরকারের এই উদ্যোগ তাই নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
(লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
আরএন