
সংগৃহীত ছবি
কক্সবাজারের পাঁচ তারকা মানের সিগাল হোটেলের রেস্তোরাঁয় এক পর্যটককে দেশী মুরগির পরিবর্তে সোনালী মুরগি পরিবেশন করা হয়েছে-এমন অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওই পর্যটকের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে হোটেলের রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপক কামরুল ওই পর্যটককে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ ও বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তবে ওই ব্যক্তি ফোনে তার সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
এ ঘটনায় একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় সিগাল হোটেল রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক কামরুল বলেন, তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক ভালো এবং বিষয়টি অনেকেই জানেন। তিনি আরও বলেন, এটি তারেক জিয়ার হোটেল-এ কথাও অনেকে জানেন।
তবে সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, কোনো হোটেলের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীর সম্পর্ক থাকলেও সেটি কি পর্যটকদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ বা অন্যায় করার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে? জবাবে কামরুল বলেন, ‘না না, অন্যায় করব না।’
কামরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পর্যটক তাদের রেস্তোরাঁয় এসে মুরগি নিয়ে অভিযোগ করেন। তার দাবি, ওই দিন রোস্টের জন্য ভ্যাকসিন করা সোনালি মুরগি রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া একটি পার্টির জন্য বয়লার মুরগিও ছিল। কিন্তু ওই পর্যটককে আলাদাভাবে দেশি মুরগি দেওয়া হয়েছিল।
কামরুল বলেন, ‘উনাকে দেশি মুরগি খাওয়ানো হয়েছে। আমাদের রোস্টের জন্য আজকে যেটা ভ্যাকসিন করা ছিল, রোস্টের জন্য সেটা ছিল সোনালি। আর বায়ার গ্রুপ একটা পার্টি চলতেছে, এটার জন্য আছে বয়লার। কিন্তু উনারে আলাদাভাবে আমরা মুরগি দিছি—আমাদের দেশি মুরগি। আরও রান্না করা আছে। আপনি ইচ্ছা করলে আসতে পারেন, দেখতে পারেন।’
এরপর কামরুল ওই পর্যটককে ফোন করার বিষয়টি সাংবাদিককে জানান। তিনি বলেন, ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে সালাম দেন এবং বলেন, ‘স্যার, আমি কামরুল বলছি, হোটেল সিগাল রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার। স্যার, আপনি মনে হয় কিছুক্ষণ আগে আমাদের রেস্টুরেন্টে এসছিলেন। আপনার একটা অভিযোগ আছে।’
কামরুলের দাবি, পরিচয় দেওয়ার পর ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি যেখানে যেখানে কথা বলার প্রয়োজন, আমি সেখানে সেখানেই কথা বলব। আমি কত দূর পারি, আপনারা তো জানেন না।’ এরপর তাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত না করার কথাও বলেন ওই ব্যক্তি।
কামরুল আরও বলেন, ওই ব্যক্তি সম্ভবত সোনালি মুরগি খাওয়ানোর বিষয়টি প্রমাণের জন্য কোনো নথি বা কাগজপত্র রাখবেন বলে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কামরুল বলেন, তিনি ওই ব্যক্তির বিল দেখেছেন এবং বিলটি পাঠিয়ে দিতে চান। তার ভাষায়, ‘আমি উনার বিলটা দেখেছি। আমি উনার বিলটা পাঠায় দিব। পাঠান তো দেখি উনার বিলটা।’ পরে তিনি বলেন, বিলটি এসেছে এবং সেটি তুলনামূলকভাবে অনেক বড়।
কামরুলের দাবি, ওই ব্যক্তি তাকে ‘মোটামুটি একটা হুমকি’ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি ওই পর্যটকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করার এবং ক্ষমা চাওয়ার জন্য ফোন করেছিলেন এবং বিলটিও পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি তার কথা শোনেননি।
এ সময় সাংবাদিক তাকে বলেন, একজন পর্যটকের অভিযোগ করার অধিকার আছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ কীভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে সমাধান করবে, সেটি তাদের ব্যবসায়িক বিষয়। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারটা আমরা চাচ্ছি পর্যটকবান্ধব একটা শহর হোক।’
সাংবাদিক আরও বলেন, কোনো পর্যটক অভিযোগ করলে হোটেল কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে গেলে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের সামনে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে।
এরপর কামরুল আবার বলেন, ‘আমার এমডির সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক আছে। এটা অনেকে জানে। আপনারাও জানেন যে এটা অনেক মানুষে জানে। এটা তারেক জিয়ার হোটেল, অনেকেই জানে।’
তখন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, এ ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা একজন পর্যটকের অভিযোগের প্রসঙ্গে বলা কি ঠিক হচ্ছে? জবাবে কামরুল বলেন, ‘না না, সেটা না।’
তিনি বলেন, ওই পর্যটক যেভাবে তাকে হুমকি দিয়েছেন, সে প্রসঙ্গেই তিনি এসব কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘হ্যাঁ, যেভাবে হুমকি আমাকে এগুলো এগুলো... পর্যটক—এই কথা যদি আপনারা ব্যবহার করেন পর্যটকদের জন্য, এটা ভুল না।’
এরপর সাংবাদিক তাকে বলেন, তিনি একজন অতিথিকে নিয়ে কথা বলছেন এবং সাংবাদিক হিসেবে তাকে ফোন করা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য কক্সবাজারকে আরও নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সাংবাদিক বলেন, একজন পর্যটকের অভিযোগের জবাবে ‘তারেক জিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক’ কিংবা ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক’ থাকার কথা বলা ঠিক নয়।
সাংবাদিকের ভাষায়, ‘আমি সাংবাদিক হিসেবে আপনাকে কল দিয়েছি। আপনি আমাকে বলতেছেন তারেক জিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক—আপনি একটা ভুল করবেন।’
জবাবে কামরুল বলেন, ‘ভুল করার জন্য সে প্রতিকার চাইবে।’
আলোচনার শেষ দিকে কামরুল আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি যেভাবে ‘লিডারের’ কথা বলেছেন এবং কী করবেন, কোথায় অভিযোগ করবেন-এসব বিষয় তিনি সাংবাদিককে জানাচ্ছেন।
সাংবাদিক তখন বলেন, হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো পর্যটকের অভিযোগ বা বিরোধ থাকলে সেটি নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা উচিত। কোনো পর্যটক অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ম্যাজিস্ট্রেট এলে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে নিজেদের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনে কোনো পর্যটককে প্রভাবিত বা ভয় দেখানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
ঘটনাটি নিয়ে ওই পর্যটক পরে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করবেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
টিআইএস