বুদ্ধির প্রয়োগ করে কাজকে সহজ করার উপায় হলো প্রযুক্তি। পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে মহাকাশযান তৈরি—সবই প্রযুক্তি। বিজ্ঞান হলো প্রযুক্তির আঁতুড়ঘর। বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ আবিষ্কার কিংবা সাধারণ মানুষের প্রকৃতিলব্ধ অনুশীলন চর্চা—সবকিছুই প্রযুক্তির আওতাভুক্ত। প্রযুক্তি শূন্য থেকে সৃষ্টি হয় না, প্রযুক্তি কারো একক কৃতিত্বও নয়। ইটের পর ইট গেঁথে যেমন সৃষ্টি করা হয় দালানকোঠা, তেমনি বিন্দু বিন্দু আবিষ্কার এক সুতোয় মালা গেঁথে তৈরি হয় বিস্ময়কর প্রযুক্তির রঙিন সমাহার। আজকের যুগে তথ্য-প্রযুক্তি বিকাশ কিন্তু সেই সুদূর অতীতে বাইনারি পদ্ধতির যোজিত ফল। মাটিতে দাগ কেটে কেটে বাঘবন্দি খেলা আজকের মাল্টি মিলিয়ন ডলারের গেম ইন্ডাস্ট্রির সূতিকাগার। সৃষ্টিকর্তা ব্যক্তির জ্ঞানকে সীমিত রেখেছেন, কিন্তু সমষ্টির জ্ঞান বেড়ে চলেছে জ্যামিতিক হারে। মহাবিশ্বের অসীমত্ব যেমন সত্য, তেমনি সত্য মানুষের অসীম জ্ঞানভাণ্ডার, নতুন নতুন আবিষ্কারের সীমাহীন নেশা।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথায়—‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।’ এখানে ব্যক্তির সসীম অস্তিত্বের মাঝে স্রষ্টার অসীমত্বের অবস্থান করার কথা বলা হয়েছে। তবে সমষ্টিগতভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় স্রষ্টার অসীমত্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলে তার সৃষ্টির অসীমত্বও। এখানে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে মনে—অসীমের মাঝে অসীম বিরাজ করলে বা অসীমের সাথে অসীম চললে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সংঘর্ষ বাঁধে কেন? কেন যে প্রযুক্তি আজকের জন্য জাদুকরী সমাধান, কালকেই হয়ে যায় ক্ষতিকর? আজকে যা জীবনযাপনকে আরামদায়ক করে, পরবর্তীকালে কেন হয় তা জীবন ধ্বংসকারী? এটি চিন্তাজগতের নিয়ম এবং মহাবিশ্বের স্থান-কাল-পাত্রের নিয়মের মধ্যে সুর-তাল-লয়ের গরমিলের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ প্রযুক্তি বানায়। আজকের প্রয়োজন আগামীর প্রয়োজনচিত্রকে ধারণ করতে তাগিদ অনুভব করে না, কিংবা তাগিদ থাকলেও কালের প্রবাহ স্থানিক পরিবর্তনকে ঠিকভাবে ধারণ করতে পারে না।
মহাবিশ্বে সকল অস্তিত্বই গতিশীল। স্থিতিশীল যা দেখি বা অনুভব করি তা আপাত সত্য, তাকে আপেক্ষিক ভ্রমও বলতে পারি, আবার আপেক্ষিক বা আংশিক সত্যও বলতে পারি। কালের কোলে বসে বা কালস্রোতের তীরে বসে আমরা যে সমাধান বের করি তা সাময়িক ভারসাম্য দেয়, সামগ্রিক নয়। মুক্তির পথে পথিকের বেলায়ও একই নিয়ম প্রযোজ্য। বাধার পর বাধা অতিক্রম করে যে পথিক হেঁটে চলে, প্রতিটি পদক্ষেপই তার জন্য আশার আলো দেখায়। তবে মাঝেমধ্যে খাদের গভীরে পড়ে হা-হুতাশ করতেই হয়।
প্রযুক্তি তথা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সম্মিলিত ফল মুক্তির পথে এগিয়ে চলাকে সহজ করে। আবার একই প্রযুক্তি এ পথকে দুর্গম করে তুলতে পারে, এমনকি ফেলে দিতে পারে গভীর খাদে। তা নির্ভর করে প্রযুক্তির প্রয়োগের ওপর। তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—প্রযুক্তির কল্যাণ-অকল্যাণ কি নির্ভর করে ভিন্ন কোনো সত্তার মর্জির ওপর? তা ছাড়া কল্যাণ-অকল্যাণ তো কেবল বস্তুগত বিষয় নয়, ব্যক্তিনিরপেক্ষ কল্যাণ-অকল্যাণ অকল্পনীয়ও বটে। কাজেই প্রযুক্তি নিজে নিজে দোষী বা নির্দোষ নয়। একই আবিষ্কার যেমন ডিনামাইট, সুইডেনের পাথুরে পাহাড় ধ্বংস করে সৃষ্টি করছিল শস্য ফলানোর উপযোগী জমি, জীবনের আশ্রয়। ওই ডিনামাইটই আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে ধ্বংস করছে হাজারো প্রাণ। ল্যাবরেটরিতে জীবাণু আবিষ্কার যেমন প্রাণ রক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তেমনি তা জীবাণু অস্ত্র হিসেবেও হতে পারে সভ্যতার বিনাশকারী। মানুষ বর্বর জীবন থেকে মুক্তি চেয়েছে, মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে, মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে প্রযুক্তি বানিয়েছে।
যুগ যুগ ধরে উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে প্রযুক্তি। মুক্তির পথে এগিয়ে চলছে মানবসমাজ। প্রযুক্তি যত বেশি প্রস্ফুটিত হবে, হবে বৈচিত্র্যময়, বহুত্বকে যত বেশি সহনীয়ভাবে ধারণ করবে, মুক্তির পথে এগিয়ে চলা ততই সহজ হবে। তবে বিষয়টি আমরা যত সহজভাবে চিন্তা করছি, আসলে তা হওয়ার নয়। মানুষের মধ্যেই অনেকে আছে মানুষরূপী দানব, মনুষ্য অবয়ব নিয়ে শয়তান, তারা সবসময় চায় প্রযুক্তিকে তাদের কুহকী শক্তির করায়ত্তে রেখে ক্ষমতার দাম্ভিকতায় ধ্বংস খেলায় মেতে থাকতে—কম্পিউটারে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার মতোই বাস্তব যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে আনন্দ পেতে চায় তারা। এদের হাত থেকে প্রযুক্তিকে মুক্ত করতে না পারলে মুক্তির পথে তথা প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। প্রযুক্তিকে তাই সবসময় মুক্তির সংগ্রামে সাথি করে চলতে হবে নিরন্তর।
কবি ও প্রাবন্ধিক
(লেখকের মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর গ্রন্থ থেকে পুনঃমুদ্রিত)