Friday | 5 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Friday | 5 June 2026 | Epaper
BREAKING: আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে শোকজ, ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম      চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে তিন নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু      যেসব গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার       প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি: গ্রেপ্তার ২      আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার প্রমাণ স্পষ্ট: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      বন্ধ কল কারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত      রামিসা হত্যা মামলার রায় রোববার      

লিউভেন ও ঢাকা: স্মার্ট ইকো সিটির নীল নকশা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৯:০৯ পিএম   (ভিজিট : ৩৫)

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের এক গল্পে দেখা যায়, তিনি একবার তাঁর প্রিয় গাধাটি খুঁজছিলেন। লোকেরা অবাক হয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, "কেন খুঁজছ? তোমার তো কোনো গাধা নেই!" মোল্লা সাহেব উত্তরে বললেন, "যদি না খুঁজি, তাহলে কখনোই পাব না!"

ভাবা যায় কি দুর্দান্ত চিন্তা। শুধু হারিয়ে গেলেই খুঁজতে হবে? না থাকলেও তো খুঁজে পেতে হবে! বাংলাদেশ পরিবেশের যে কোনো সূচকে ঈর্ষণীয় নয়। বিশ্বের ঈর্ষণীয় একটি শহর হচ্ছে বেলজিয়ামের Leuven। বেলজিয়ামের লিউভেন শহর ২০২০ সালে 'ইউরোপীয় ক্যাপিটাল অফ ইনোভেশন' হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। তাদের "Leuven 2030" মিশন এবং নেটওয়ার্কড স্মার্ট সিটি স্ট্র্যাটেজি যানজট ও দূষণ সমস্যার সমাধানে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

লিউভেন 'আরবান সেন্স' ডেটা প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করেছে। কার-ফ্রি সেন্টার, হেরিটেজ কনজার্ভেশন ইত্যাদি পরিকল্পনা শহরকে একটি ইকোস্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করেছে। এর পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ ও সহায়তা, কর্পোরেট ও নাগরিক নেটওয়ার্কিং। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সরকার চিহ্নিত করে সংস্কার করে দেয়, শহরে মাটি পাওয়া যায় যেখানে ঘন ও দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষ রয়েছে, বাচ্চারা স্কুল থেকে ফেরার পথে কিডস প্লে জোনের টিকিট কাটে না, পার্কেই খেলাধুলা করে জামা নোংরা করে ঘরে আসে। এমন নানা পরিকল্পনা শহরটিকে ইউরোপিয়ান ক্যাপিটাল অফ ইনোভেশন ২০২০ পুরস্কার এনে দেয়। সেই শহরের লোকজন একে লিউভেন না ডেকে Lutopia বলে আদর করে ডাকে। ঢাকাকে আমরা আর আদর করে ডাকতে পারি না কিছুই। তাই বলে ঢাকাকে আদর করে ডাকার কিছু কি খুঁজবো না? আমাদের খুঁজে পেতেই হবে। ইতিমধ্যে ঢাকায় AI ক্যামেরা দিয়ে সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো লিউভেনেও এই পদ্ধতি চালু আছে।

বেলজিয়ামের শহরটি ইউরোপের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (Nature-Based Solutions) এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল শহর গড়ে তোলা হচ্ছে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে KU Leuven বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ইনোভেটিভ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা ও গবেষণায় নয়, শহরের পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়নেও সক্রিয়ভাবে অবদান রাখছে। বাংলাদেশেও সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সরকারের ও দেশের জন্য প্রতিদান ফেরত চাওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভালো চাকুরিজীবী বানানোর কারখানা হলে হবে না। এই প্রকট সময়ে শহর, দেশ ও মানুষ বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকায় যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তাদের এখন দেয়ার পালা। নগর পরিকল্পনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, আরামদায়ক, ঝাঁকিরোধক ও স্বাস্থ্যসম্মত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার নকশা প্রণয়ন, সড়কের আধুনিক নকশা প্রণয়ন, সড়কবাতির সঠিক ব্যবহার ও স্থাপন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শব্দশোষক আবিষ্কার ও স্থাপন, ইকো সিটি পরিকল্পনা ইত্যাদি বহুক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবদান রাখতে পারে। বিদ্যালয় ও কলেজে চিত্র প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র জাতির ও স্বাধীনতার জন্য অবদান রাখা দু-একজন নেতার ছবি আঁকা বন্ধ করে পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা, মানবিকতা ও টেকসই উন্নয়নকেও চিত্রাঙ্কন এজেন্ডাভুক্ত করা উচিত। আপনাদের মনে থাকার কথা; এক শিশুবাচ্চার আঁকা কোনো এক নেতার ছবি নিয়ে এক আমলার দূরবস্থার করুন কাহিনী।

KU Leuven শহরের Strategic Green Plan-এর মতো মূল দলিলগুলোর পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও গবেষণা সরবরাহ করে। এই পরিকল্পনায় শহরকে চারটি প্রাকৃতিক নগর ল্যান্ডস্কেপে (City Center, Northern Lowlands, Agricultural Plateau, Hill Country) বিভক্ত করে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ইকোসিস্টেম সার্ভিসেসের ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে গাছপালা, নদী, জলাভূমি এবং সবুজ ছাদের মাধ্যমে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বন্যা প্রতিরোধ, বায়ু বিশুদ্ধকরণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার কৌশল তৈরি করেছেন। Dijle নদীর উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সরাসরি সাহায্য করেছে, যেখানে নদীর তীরকে পুনরুজ্জীবিত করে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনোদনমূলক স্থান তৈরি করা হয়েছে। Lighthouse Districts প্রকল্পে সবুজ তাপ (green heat) ব্যবস্থা এবং নগর সবুজায়নের কাজে KU Leuven সরাসরি জড়িত। এছাড়া KU Leuven প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামাজিকভাবে ন্যায্য প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নে গবেষণা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান শুধু গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। হাইড্রোজেন প্যানেলের মতো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন (যা সূর্যের আলো ও বাতাসের আর্দ্রতা থেকে সস্তা ও পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন উৎপাদন করে) শহরের শক্তি সরবরাহ ও টেকসই উন্নয়নে নতুন দিগন্ত খুলেছে। এসব প্রযুক্তি শহরের ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

টপোজ ম্যাগাজিন তাদের ফিচারে লিউভেনের স্মার্ট ইকো ফিউচার ভিশনের ব্যবচ্ছেদ করেছে। তাদের আবিষ্কার হচ্ছে লিউভেন শহরকে ইকোলজিক্যালি চারভাগে ভাগ করে পরিকল্পনা করা।

১. সিটি সেন্টার: বিশুদ্ধ ও ঠান্ডা বায়ু নিশ্চিত করতে সবুজ ছাদ ও বৃক্ষায়নে জোর দেওয়া
২. উত্তরের নীচু অঞ্চল: বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় জলাধার তৈরিতে নজর দেওয়া
৩. দক্ষিণাংশের আবাদভূমি: খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও খোলা প্রান্তর রক্ষা
৪. পার্বত্য এলাকা: মাটি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জোর দেওয়া

উপরোক্ত ৪টি বিষয় ঢাকায় হুবহু বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। তাই এই পরিকল্পনা থেকে থিমেটিক জ্ঞান নিয়ে আমরাও ঢাকাকে আরও সবুজ, ঠান্ডা ও সতেজ করতে পারি। প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বা এনবিএস (NBS) হলো এমন একটি ধারণা যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব প্রক্রিয়াগুলোকে ব্যবহার করে পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা হয়। লিউভেন শহরের জন্য ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত 'স্ট্র্যাটেজিক গ্রিন প্ল্যান' (Strategic Green Plan) এই ধারণার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ফেলিক্স (Felixx) এবং ভিটেভিন+বস (Witteveen+Bos) নামক নকশা প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা এই পরিকল্পনাটি মূলত শহরকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সুরক্ষিত করার পরিবর্তে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি একক নগর ভূদৃশ্য (Cohesive Urban Landscape) তৈরির ওপর জোর দেয়। এই পরিকল্পনায় ডাইলা নদী (Dijle River) এবং এর শাখা-প্রশাখাগুলোকে একটি নিরবচ্ছিন্ন "সবুজ-নীল নেটওয়ার্ক" (Green-blue network) বা শহরের 'সবুজ মেরুদণ্ড' হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ঢাকাতে শীতলক্ষা, কাঞ্চন, বালু, তুরাগ, বুড়িগঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি নদী রয়েছে শহরের সীমানা জুড়ে। শুধু ব্রিজ তৈরি, সড়ক নির্মাণ ও নদীর পাড় বাঁধানোতে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীনির্ভর ইকো-অর্থনীতি ও পর্যটন/হাইকিং এবং স্থানীয় আবাদ সংরক্ষণের মতো সাধারণ বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। শুধুমাত্র পূর্বাচলে কাঞ্চন নদীর পাড়ে অর্ধশতাধিক সুইমিংপুল ও নদীতে সাঁতার এবং নৌকা চালানোর সুবিধাযুক্ত রিসোর্ট ব্যবসা সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নযোগ্যতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। রয়েছে সোনারগাঁও, পানাম নগরী, ইদ্রাকপুর দুর্গ, অতীশ দীপংকরের আবাস, লালবাগ দুর্গ, আহসান মঞ্জিল, জমিদার বাড়ি, মাওয়াঘাট, দৃষ্টিনন্দন সড়ক ও ব্রিজ। প্রতিটি নদী হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকেন্দ্র। অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রসার খুবই সহজ ভাবনা। অন্যদিকে বাস্তবতা হচ্ছে, নদীর তীরস্থ ঢাকার বসিলা এলাকা অপরিকল্পিত নগরায়নের দুঃস্বপ্ন জাতীয় কেস হওয়ার আগেই সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

সবুজ শক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কেইউ লিউভেনের অধ্যাপক জোহান মার্টেন্সের (Johan Martens) নেতৃত্বে গবেষক দল একটি 'হাইড্রোজেন প্যানেল' উদ্ভাবন করেছে, যা সরাসরি বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প (Moisture) এবং সূর্যালোক ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে পারে। এই নতুন ১.৬ বর্গমিটারের প্যানেলটি সরাসরি ১৫% সূর্যালোককে হাইড্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত করে, যা সাধারণ উপাদান দিয়ে তৈরি ডিভাইসের ক্ষেত্রে একটি বিশ্ব রেকর্ড। এটি সোলার শক্তির চেয়েও সুলভ ও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। প্রযুক্তিটি পেতে স্বয়ংচালিত গাড়ি নির্মাতা টয়োটা গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

একবার হোজ্জা তার গাধার পিঠে উল্টো হয়ে বসে যাচ্ছিলেন। লোকে জিজ্ঞেস করল, "হোজ্জা সাহেব, উল্টো বসেছেন কেন?" হোজ্জা উত্তর দিলেন, "আমি ঠিকই আছি, গাধাটা ভুল দিকে যাচ্ছে!" আমাদের বর্তমান অপরিকল্পিত নগরায়নও যেন হোজ্জার গাধার মতো ভুল পথে না যায়, তা নিশ্চিত করতে লিউভেনের মতো দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রয়োজন।

লেখক: গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নদীতীরবর্তী ঢাকাবাসী




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close