একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে উন্নয়নের নতুন নাম কূটনীতি। যে রাষ্ট্র যত দক্ষতার সঙ্গে তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে, সে রাষ্ট্র তত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, উন্নয়নের জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, বহুমাত্রিক সহযোগিতা এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক নেতৃত্ব।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে তাই নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন এক কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে গেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে নতুন সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল উদাহরণ। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। বর্তমানে কয়েক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে কেবল শ্রমবাজার নয়, বর্তমান বিশ্বে দক্ষ জনশক্তিই সবচেয়ে বড় সম্পদ। মালয়েশিয়া সফরে যদি কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্ভবত চীনকে ঘিরেই। কারণ গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে চীনের নাম জড়িয়ে আছে। সড়ক, রেল, সেতু, বিদ্যুৎ, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি উন্নয়নের
ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। নদীর নাব্যতা, পানির স্বল্পতা, ভাঙন এবং সেচ সংকট দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে আছে। যদি আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা, সেচ সুবিধা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাওয়া যায়, তাহলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতিকে পরিচালিত করবে। বাংলাদেশ যদি এই খাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
তবে চীন ও মালয়েশিয়া সফরের গুরুত্ব কেবল অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন বাস্তবতাকেও তুলে ধরে। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ এককভাবে উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, জাপান, আসিয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এখন একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের ফলে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বাংলাদেশ যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত অবকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারবে। এ ক্ষেত্রে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক আস্থা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্বের অনেক দেশই নতুন সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার পর্যবেক্ষণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরগুলো আন্তর্জাতিক মহলে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে যে বাংলাদেশ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও সহযোগিতাকেই অগ্রাধিকার দিতে চায়।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে প্রত্যাশিত সুফল আসেনি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।
বাংলাদেশের জনগণ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদি এই সফরগুলো সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা দেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সুতরাং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, উন্নয়ন কৌশল এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দক্ষ নেতৃত্ব, বাস্তবমুখী কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে এই সফর সত্যিই বাংলাদেশের জন্য খুলে দিতে পারে অমিত সম্ভাবনা ও উন্নয়নের নতুন দুয়ার।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com