ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: স্বপ্ন, সাহস ও বাস্তবতার সমন্বয়
✎ সিরাজুল ইসলাম
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫২ পিএম আপডেট: ২৪.০৭.২০২৬ ১১:১৫ পিএম
X

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—আমরা কি কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, শিল্পভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হব? এই প্রশ্নের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে এনেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার জন্য সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ফরেন ইনভেস্টমেন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে দেওয়া তাঁর বক্তব্য শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে কোনো আনুষ্ঠানিক আহ্বান ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকারের ঘোষণা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য কি বাস্তবসম্মত? উত্তর হলো—সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় পাঁচশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আগামী আট বছরে অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। এটি অর্জন করতে হলে শুধু বার্ষিক উচ্চ প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উৎপাদনশীলতার ব্যাপক বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সবচেয়ে বড় কথা—বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে যেসব অগ্রাধিকার খাতের কথা বলেছেন—নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকস—এসবই বিশ্ব অর্থনীতির আগামী দশকের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে বাংলাদেশের এরই মধ্যে কিছু শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সঠিক নীতি-সহায়তা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পেলে এই খাতগুলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রায় ২০ কোটি মানুষের এই দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার এখনও অনেক বেশি। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ যখন দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'। কিন্তু এই সম্ভাবনা কেবল তখনই সম্পদে পরিণত হবে, যখন তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির উপযোগী দক্ষতা দেওয়া যাবে।

মনে রাখতে হবে—শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে আগামী দশকের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন হাবে পরিণত করার যে লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, সেটিও সময়োপযোগী। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন কেন্দ্রের বৈচিত্র্যের কারণে বহু আন্তর্জাতিক কোম্পানি নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য খুঁজছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু বক্তৃতা নয়, বাস্তব সংস্কারই হবে মূল চাবিকাঠি।

প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের সামনে যেসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন—আইনি সুরক্ষা, ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ, মুনাফা নির্বিঘ্নে নিজ দেশে নেওয়ার সুযোগ, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো—এসবই বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রধান দাবি ছিল। ইতিবাচক দিক হলো, সরকার এসব দাবিকে স্বীকার করেছে এবং বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। একটি শিল্প স্থাপনে কখনো কখনো কয়েক ডজন সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি বিনিয়োগ ব্যয়ও বেড়ে যায়। ডিজিটাল সরকারি সেবা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর, সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কেবল শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না; পণ্য কত দ্রুত, কত কম খরচে এবং কত নির্ভরযোগ্যভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটিকে আরও বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। উচ্চমূল্যের টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, মেডিকেল টেক্সটাইল, পরিবেশবান্ধব পোশাক এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারলে রপ্তানি আয়ে নতুন মাত্রা যোগ হবে। একই সঙ্গে ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং ইলেকট্রনিক্স খাতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ—ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর—তাদের শিল্প বিপ্লবের বড় অংশই বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশও যদি সেই পথ অনুসরণ করতে চায়, তাহলে নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, শুধু উদ্যোক্তার দক্ষতা নয়; সরকারের প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতিও ব্যবসার সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সফল অর্থনীতি গড়ে ওঠে তখনই, যখন সরকার নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত, উৎপাদক এবং জনগণ অংশীদারে পরিণত হয়।

তবে এই যাত্রাপথে কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—সবকিছুই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিক নীতি, দক্ষ প্রশাসন, জবাবদিহি এবং সময়মতো সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান। এই প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অর্থনীতির আকার বড় হলেও যদি তার সুফল সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা—এই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ।

সবশেষে বলা যায়, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কোনো জাদুকরী সংখ্যা নয়; এটি একটি দিকনির্দেশনা। এই লক্ষ্য জাতিকে বড় করে ভাবতে শেখায়, নীতিনির্ধারকদের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়—বাংলাদেশ বড় হতে চায়, আরও দ্রুত এগোতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ঘোষণাকে যদি কার্যকর সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে ২০৩৪ সালের বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার দেশ হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস বলে, বড় জাতিগুলো বড় স্বপ্ন দেখেই এগিয়েছে। আমাদের এখন প্রয়োজন এমন স্বপ্নকে পরিকল্পনায়, পরিকল্পনাকে কর্মে এবং কর্মকে ফলাফলে রূপান্তর করার। যদি সরকার, বেসরকারি খাত এবং জনগণ একই লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকবে না; বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।

লেখক—সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝