আগামী ১১ জুন থেকে শুরু ফুটবলের মহাযজ্ঞ: তিন দেশ, ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ আর কোটি মানুষের স্বপ্ন। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে যখন উদ্বোধনী বাঁশি বাজবে, তখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি টাইম জোনে মানুষ থমকে দাঁড়াবে। অফিসে, ক্যাফেতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে, গ্রামের চায়ের দোকানে- সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে একটাই: বিশ্বকাপ।
আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। তবে এবার বিশ্বকাপ শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটি দেশে- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো। প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হবে ১০৪টি ম্যাচ। বিশ্বকাপ চলবে ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত, মোট ৩৯ দিন।
কতগুলো মাঠে খেলা হবে?
মোট ১৬টি স্টেডিয়ামে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র (১১টি শহর)- নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, মিয়ামি, আটলান্টা, হিউস্টন, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটল, বোস্টন, কানসাস সিটি, সান ফ্রান্সিসকো বে, এরিয়া।
কানাডা (২টি শহর)- টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার।
মেক্সিকো (৩টি শহর)- মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, মন্টেরে।
ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
নতুন ফরম্যাট কী?
আগে ছিল ৩২ দল। এবার ৪৮ দল।
গ্রুপ পর্ব- ১২টি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপে ৪টি দল। প্রতিটি দল খেলবে ৩টি ম্যাচ। নকআউট পর্বে উঠবে
১২ গ্রুপের শীর্ষ দুই দল = ২৪ দল। সেরা ৮টি তৃতীয় স্থানধারী দল অর্থাৎ মোট ৩২টি দল যাবে নকআউটে।
এরপর: রাউন্ড অব ৩২
শেষ ষোল -> কোয়ার্টার ফাইনাল -> সেমিফাইনাল-> ফাইনাল।
এই ফরম্যাট বিশ্বকাপকে আরও অনিশ্চিত ও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
সেমিফাইনালে কারা যেতে পারে?
বিশ্বকাপে ভবিষ্যদ্বাণী সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও বর্তমান ফর্ম, স্কোয়াড গভীরতা এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্টদের তালিকায় রয়েছে-
আর্জেন্টিনা- বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অভিজ্ঞতা এখনো বড় শক্তি। তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশ্রণ তাদের অন্যতম ফেবারিট করেছে।
ফ্রান্স- অসাধারণ আক্রমণ ভাগ এবং গভীর বেঞ্চ শক্তি তাদের সবসময় ভয়ংকর প্রতিপক্ষ বানায়।
স্পেন- তরুণ প্রতিভা ও আধুনিক পজেশন ফুটবলের কারণে স্পেনকে অন্যতম দাবিদার ধরা হচ্ছে।
ব্রাজিল- বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিলের স্বপ্ন। প্রতিভার অভাব নেই; প্রশ্ন কেবল ধারাবাহিকতা।
তবে জার্মানি, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল এবং স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রও বড় চমক দেখাতে পারে।
যাদের দিকে থাকবে সবার নজর
লিওনেল মেসি- এটাই কি তাঁর শেষ বিশ্বকাপ? কোটি সমর্থকের সবচেয়ে আবেগঘন প্রশ্ন।
কিলিয়ান এমবাপে- গতি, গোল এবং নেতৃত্ব- ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
জুড বেলিংহাম- ইংল্যান্ডের মধ্যমাঠের প্রাণশক্তি।
ভিনিসিয়াস জুনিয়র- ব্রাজিলের আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা।
লামিনে ইয়ামাল- স্পেনের বিস্ময়বালক; এই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ।
আর্লিং হলান্ড- শক্তি ও গোলের মেশিন।
নিয়ম-কানুন: যা জানা জরুরি
ম্যাচের সময়: দুই অর্ধে ৪৫ মিনিট করে, মোট ৯০ মিনিট। অতিরিক্ত সময় যোগ হবে।
বদলি- ৫ জন খেলোয়াড় বদল করা যাবে। অতিরিক্ত সময়ে একটি অতিরিক্ত বদলির সুযোগ।
অফসাইড- আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড় বল গ্রহণের সময় দ্বিতীয় শেষ ডিফেন্ডারের সামনে থাকলে অফসাইড ধরা হবে।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি গোল, পেনাল্টি, লাল কার্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করবে।
নকআউটে ড্র হলে- ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময়। এরপর টাইব্রেকার।
স্কোয়াড- প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ২৬ জন খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারবে।
নিরাপত্তা ও আয়োজন- তিন দেশে একসঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজন নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ। ৪০০-এর বেশি নিরাপত্তা সংস্থা কাজ করবে স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন ও পরিবহন ব্যবস্থায়। এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া নিরাপত্তা অভিযানগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এই বিশ্বকাপ আলাদা?
কারণ এটি শুধু ফুটবলের টুর্নামেন্ট নয়। এটি অভিবাসনের গল্প। এটি পরিচয়ের গল্প। এটি কোটি মানুষের স্বপ্নের গল্প। একটি ছোট দেশের শিশু যখন বাড়ির উঠোনে বল নিয়ে দৌঁড়ায়, কিংবা কোনো মহানগরের বহুতল ভবনে বসে পরিবারসহ ম্যাচ দেখে- বিশ্বকাপ তাদের একই আবেগে যুক্ত করে।
১১ জুনের প্রথম বাঁশি থেকে ১৯ জুলাইয়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবী আবারও ফুটবলের ভাষায় কথা বলবে।
কেউ ট্রফি জিতবে।
কেউ হৃদয় জিতবে।
কেউ ইতিহাস লিখবে।
আর কোটি কোটি মানুষ আবারও বিশ্বাস করবে- একটি বল কখনো কখনো পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতে শেখাতে পারে।
বিশ্বকাপ ২০২৬ এক নজরে
শুরু: ১১ জুন ২০২৬
ফাইনাল: ১৯ জুলাই ২০২৬
আয়োজক দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো
দল: ৪৮টি
ম্যাচ: ১০৪টি
স্টেডিয়াম: ১৬টি
নকআউট শুরু: রাউন্ড অব ৩২
ফাইনাল ভেন্যু: মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি।
এমএ