ফুটবল বিশ্বকাপ আর আগের মতো নেই। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘতম এবং সম্ভবত সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসর। প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। স্বাগতিক তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ম্যাচ হবে ১০৪টি। আর এই আসরই নির্ধারণ করে দিতে পারে এক যুগের অবসান এবং আরেক নতুন যুগের সূচনা।
বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আবেগের গল্প নয়; এটি ফুটবল রাজনীতির পরিবর্তন, বিশ্বায়নের নতুন অধ্যায় এবং প্রতিভার সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী।
নতুন ফরম্যাট: কীভাবে হবে বিশ্বকাপ?
১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বকাপে খেলত ৩২টি দল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮-এ।
৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে, প্রতিটি গ্রুপে থাকবে ৪টি করে দল। প্রতিটি দল খেলবে তিনটি করে গ্রুপ ম্যাচ।
গ্রুপপর্ব শেষে
* ১২টি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল (মোট ২৪টি)
* সেরা ৮টি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল
উঠে যাবে নতুন সংযোজিত রাউন্ড অব ৩২-এ।
এরপর শুরু হবে নকআউট পর্বের লড়াই। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে হলে কোনো দলকে খেলতে হবে সর্বোচ্চ ৮টি ম্যাচ।
এই প্রথম তিনটি দেশ যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। দেশগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো.
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। মেক্সিকো ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক হচ্ছে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা উদ্বোধনী ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। অন্যদিকে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে মহারণের ফাইনাল।
কতটি স্টেডিয়ামে খেলা হবে?
বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৬টি স্টেডিয়ামে।
যুক্তরাষ্ট্র (১১টি)
* MetLife Stadium (নিউ জার্সি)
* SoFi Stadium (লস অ্যাঞ্জেলেস)
* AT&T Stadium (ডালাস)
* Mercedes-Benz Stadium (আটলান্টা)
* Hard Rock Stadium (মিয়ামি)
* Arrowhead Stadium (কানসাস সিটি)
* Levi's Stadium (সান্টা ক্লারা)
* Lincoln Financial Field (ফিলাডেলফিয়া)
* Gillette Stadium (বোস্টন)
* Lumen Field (সিয়াটল)
* NRG Stadium (হিউস্টন)
কানাডা (২টি)
* Toronto Stadium
* BC Place (ভ্যাঙ্কুভার)
মেক্সিকো (৩টি)
* Estadio Azteca (মেক্সিকো সিটি)
* Estadio BBVA (মন্টেরে)
* Estadio Akron (গুয়াদালাহারা)
কারা হতে পারেন টুর্নামেন্টের বড় তারকা?
এই বিশ্বকাপ হতে পারে কয়েকটি প্রজন্মের মিলনমেলা।
কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)
সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ড। গতি, ফিনিশিং ও বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্যতম সেরা দাবিদারে পরিণত করেছে।
লামিন ইয়ামাল (স্পেন)
কিশোর প্রতিভা থেকে বিশ্বতারকায় রূপান্তরের পথে। স্পেনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এখন অনেকটাই তার কাঁধে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল)
কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র হতে পারেন তিনি।
জুড বেলিংহ্যাম (ইংল্যান্ড)
মিডফিল্ডের আধুনিক প্রতীক। গোল করা, খেলা তৈরি করা এবং নেতৃত্ব—সবই আছে তার মধ্যে।
এরলিং হালান্ড (নরওয়ে)
প্রথমবার বিশ্বকাপে নিজেকে প্রমাণের বড় মঞ্চ পেতে পারেন এই গোলমেশিন।
লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
এটাই কি দুই মহাতারকার শেষ বিশ্বকাপ? ফুটবলবিশ্ব তাকিয়ে থাকবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে।
কারা সেমিফাইনালে যেতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি দল অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
স্পেন
ইউরোপের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি। তরুণ ও অভিজ্ঞতার দুর্দান্ত মিশেল।
ফ্রান্স
বিশ্বকাপের সবচেয়ে গভীর স্কোয়াড। বেঞ্চেও রয়েছে ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য।
আর্জেন্টিনা
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মেসির অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের শক্তি তাদের বড় শক্তি।
ব্রাজিল
বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। সাম্প্রতিক সময়ের ওঠানামা সত্ত্বেও প্রতিভার অভাব নেই।
সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট (বিশ্লেষণভিত্তিক পূর্বাভাস):
* স্পেন
* ফ্রান্স
* আর্জেন্টিনা
* ব্রাজিল
ডার্ক হর্স কারা?
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, চমক সব সময়ই থাকে।
মরক্কো: ২০২২ সালে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল।
কলম্বিয়া: দুর্দান্ত আক্রমণভাগ ও সংগঠিত দল।
সেনেগাল: শারীরিক শক্তি ও গতি তাদের বড় অস্ত্র।
নরওয়ে: হালান্ডকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে পারে পুরো দেশ।
কেন এই বিশ্বকাপ আলাদা?
সমালোচকরা বলছেন, ৪৮ দলের বিশ্বকাপে মান কমে যেতে পারে। সমর্থকদের একাংশের মতে, ছোট দেশগুলোর জন্য এটি নতুন সুযোগের দরজা খুলে দেবে। হয়তো এটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য- যেখানে ব্রাজিলের মতো পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন যেমন স্বপ্ন দেখে, তেমনি প্রথমবারের অংশগ্রহণকারী কোনো ছোট দেশও বিশ্বাস করে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে উত্তর আমেরিকার আকাশের নিচে তাই শুধু ফুটবল নয়, লড়বে ইতিহাস, আবেগ, পরিচয় এবং কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন। কারণ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত একটি টুর্নামেন্টের নাম নয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্মিলিত অনুভূতির নাম।
এএম