‘চিকিৎসককে বলা হয় সৃষ্টিকর্তার পরেই মানুষের দ্বিতীয় জীবনদাতা।’ কিন্তু সেই চিকিৎসকের অবহেলা, ভুল চিকিৎসা কিংবা প্রতারণার কারণে যখন কোনো রোগীর জীবন বিপন্ন হয় বা মৃত্যু ঘটে, তখন আইনি প্রতিকার কী? চিকিৎসকের কোন কাজগুলো অপরাধ, এর জন্য আপনাকে কোন আদালতে যেতে হবে, কত বছরের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে এবং আদালতে কী প্রমাণ করতে হবে সে সকল বিষয়ে আজকের নিবন্ধ।
চিকিৎসকের কোন আচরণগুলো অপরাধ ও অবহেলা?
ডাক্তারি অবহেলা বলতে শুধু মূল চিকিৎসকের গাফিলতিই নয়; এর সঙ্গে নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, টেকনিশিয়ান এবং ওষুধ সরবরাহকারীদের অবহেলাও অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত চিকিৎসকদের যেসব আচরণ অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়:
ক) রোগীকে সঠিক ভাবে পরীক্ষা না করা।
খ) ভুল ওষুধ বা ইনজেকশন প্রয়োগ এবং ভুল অপারেশন করা।
গ) অপারেশনের সময় পেটের ভেতর বা শরীরের কোথাও গজ, ব্যান্ডেজ বা চিকিৎসা উপকরণ রেখে দেওয়া।
ঘ) রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং ফি নিয়ে দর কষাকষি করা।
ঙ) নিজের উপার্জিত ডিগ্রির পাশে ভুয়া বা জাল বিদেশী ডিগ্রি জুড়ে দিয়ে প্রতারণা করা।
চ) মেডিকেল বা পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মনগড়া ও ভুল তথ্য দিয়ে জালিয়াতি করা।
ছ) হাসপাতালের সিট বা প্রয়োজনীয় সেবা বরাদ্দ না দিয়ে রোগীকে বারবার হেনস্থা করা।
প্রচলিত আইনে কী শাস্তির বিধান রয়েছে?
১. দণ্ডবিধি আইন:
আমাদের দণ্ডবিধির স্পষ্ট বিধান রয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি অবহেলা বা বেপরোয়া কাজের মাধ্যমে কারও মৃত্যু ঘটায়, তবে তা ৩০৪(ক) ধারার অধীনে অপরাধ। আদালতে এই অবহেলা প্রমাণ করতে পারলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে হতে পারে। এছাড়া, যদি গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে কোনো নারীর মৃত্যু হয়, তবে ৩১৪ ধারা অনুযায়ী চিকিৎসকের ১০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে: দণ্ডবিধির ৯২ ধারা অনুসারে, যদি কোনো চিকিৎসক সরল বিশ্বাসে রোগীর উপকারের উদ্দেশ্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন এবং এর ফলে দুর্ঘটনাবশত কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।
২. ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯:
অনেকেই হয়তো জানেন না, ফির বিনিময়ে যখন কোনো রোগী ডাক্তার, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবা গ্রহণ করেন, তখন তিনি একজন ‘ভোক্তা’। সেবা প্রদানে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে, ভুল বা অবহেলাজনিত রিপোর্ট দিলে এই আইনে মামলা করা যায়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীকে জরিমানার পাশাপাশি অভিযোগকারী আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাবেন।
৩. দেওয়ানি কার্যবিধি:
১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৯ ধারা অনুসারে, চিকিৎসকের অবহেলার কারণে আর্থিক বা শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার পরিবার স্থানীয় দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা করতে পারেন।
৪. মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০:
চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশে ‘বিএমডিসি’ রয়েছে। এই আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলা বা জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিএমডিসি ওই চিকিৎসকের নিবন্ধন) বাতিল করতে পারে।
৫. দ্য মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস্ অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২:
এই আইন অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক অফিস চলাকালীন সময়ে কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এমনকি তারা কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের মালিক বা অংশীদার (পার্টনার) হতে পারবেন না। এই আইনের ১৩ ধারা লঙ্ঘন করলে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। (যেমন: আইনে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ৪০০ টাকা ফি নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে বহুগুণ বেশি আদায় করা হচ্ছে, যা এই আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন)।
আদালতে অবহেলা প্রমাণ করতে আপনার যা প্রয়োজন:
চিকিৎসায় অবহেলার দায়ে কাউকে আইনগত ভাবে অভিযুক্ত করতে চাইলে প্রধানত তিনটি বিষয় প্রমাণ করতে হবে-
১. আইনি দায়িত্ব: প্রথমত প্রমাণ করতে হবে যে, রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যে একটি চুক্তি বা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, যার ফলে রোগীর প্রতি যত্ন নেওয়ার আইনি দায়িত্ব চিকিৎসকের ছিল।
২. দায়িত্বে অবহেলা: চিকিৎসক বা চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বা অবহেলা করেছেন।
৩. ক্ষতির কারণ: চিকিৎসকের ওই নির্দিষ্ট অবহেলা বা ব্যর্থতার কারণেই রোগী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন কিংবা মৃত্যুবরণ করেছেন।
প্রতিকার পেতে কোথায় যাবেন?
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর: বাণিজ্যিক প্রতারণা বা অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিকারের জন্য।
ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা আদালত: অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু বা ফৌজদারি অপরাধের বিচারের জন্য (দণ্ডবিধির অধীনে)।
দেওয়ানি আদালত: বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলার জন্য।
বিএমডিসি: চিকিৎসকের লাইসেন্স বা নিবন্ধন বাতিলের দাবি নিয়ে সরাসরি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করা যায়।
উচ্চ আদালত: জনস্বার্থে মামলার মাধ্যমে সরাসরি হাইকোর্টে গিয়েও কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের চেষ্টা করা যায়।
শেষ কথা:
চিকিৎসকদের প্রতি সবার অগাধ শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ ও অবহেলাকারী চিকিৎসকের জন্য পুরো পেশাটি কলঙ্কিত হতে পারে না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অধিকারগুলো সবার জানা দরকার। আসুন নিজে সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও পিএইচডি ইন ল।
ইমেইল: seraj.pramanik@gmail.com
এমএ