প্রধানমন্ত্রী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে চলতি জুনের শেষ দিকে চীন সফরে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সফর বাংলাদেশ ও চীনের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং দুই দেশের সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করবে।
বৃহস্পতিবার চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরে অনুষ্ঠিত সপ্তম চায়না-সাউথ এশিয়া কো-অপারেশন ফোরামে বক্তব্যকালে তিনি এ কথা বলেন।
কায়সার কামাল বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে তা ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রবর্তক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের চীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই সফরগুলো দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, বাংলাদেশ ও চীন বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর এসব সহযোগিতাকে আরও সম্প্রসারিত ও গতিশীল করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ১৯৯১ ও ২০০২ সালের ঐতিহাসিক চীন সফর সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রণীত পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে তাঁর উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
কায়সার কামাল বলেন, জিয়াউর রহমান এমন একটি দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে দেশগুলো তাদের জনগণের শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংলাপের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার সময় এসেছে।
কায়সার কামাল মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে চীন সার্ককে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা ও বিশ্ব বাণিজ্যের অস্থিতিশীলতার মতো চ্যালেঞ্জ কোনো একক দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এসব সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক বহুমুখী উদ্যোগ, আন্তসীমান্ত অবকাঠামো, বাণিজ্য করিডর, ডিজিটাল হাইওয়ে, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন এবং তরুণদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে জনগণ ও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
ফোরামে আরও বক্তব্য দেন ইউনান প্রদেশের গভর্নর ওয়াং ইউরো, নেপাল ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ভাইস চেয়ারম্যান লায়লা কুমারী বান্দারী, মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ইরাথিশাম আদাম, শ্রীলঙ্কার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অরুন হিমাচন্দ্র, সার্কের মহাসচিব মো. গোলাম সরওয়ার, চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত খলিলুর রহমান, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদুল্লাহ বিলাল কারিমি, ভুটানের শিল্প, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যমন্ত্রী কর্মা দর্জি এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
এর আগে ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় প্রতিনিধিদল দশম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোজিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে বক্তব্য দেন।
এবারের এক্সপোজিশনে বাংলাদেশ ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে অংশগ্রহণ করছে। মেলায় বাংলাদেশের ৮৪টি প্যাভিলিয়ন অংশ নিয়েছে। বিশ্বের ৯০টি দেশের অংশগ্রহণে কুনমিংয়ে এ বৃহৎ বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সফরকালে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদল চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েই ও ইউনান প্রদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ওয়াং নিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। বৈঠকে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, পর্যটন, তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
চীনা নেতারা বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চীন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
ডেপুটি স্পিকার চীনা প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তারা তা সাদরে গ্রহণ করেন এবং শিগগির বাংলাদেশ সফরের আশা ব্যক্ত করেন।
সংসদীয় প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি, বিএনপির সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব ও সংরক্ষিত আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য জেসমিন সুলতানা জুঁই।
এসআর