একটি সরকারকে বিপদে ফেলতে সবসময় শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিছু বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং জবাবদিহিতাহীন কর্মকর্তা। তারা কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, কখনো পুরোনো অভ্যাসের বশে, আবার কখনো ক্ষমতার অপব্যবহারের নেশায় এমন সব কর্মকাণ্ড ঘটায় যা জনগণের ক্ষোভকে সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে। ফলে সরকারের অর্জন, উন্নয়ন কিংবা সদিচ্ছা—সবকিছুই ম্লান হয়ে যায় কয়েকজন কর্মকর্তার অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণে।
বাংলাদেশে নতুন সরকারের যাত্রার মাত্র একশ দিনের কিছু বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেকে একজন সহনশীল, সংযত এবং বাস্তববাদী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে তিনি বারবার জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সুশাসন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলেছেন। জনগণের মধ্যেও একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারের এই ইতিবাচক বার্তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পুলিশের কিছু সদস্যের আচরণ এমন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে যে, তারা কি সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা করছে, নাকি উল্টো জনগণের সামনে সরকারকে বিব্রত ও অজনপ্রিয় করে তুলছে?
জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য নাঈম হাসানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, চট্টগ্রামে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে তাকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে ডিবি পরিচয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে মারধর করা হয়। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও রেহাই মেলেনি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। পরবর্তীতে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরও তিনি অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
প্রশ্ন হলো, যদি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা একজন জাতীয় ক্রিকেটার নিজের পরিচয় প্রমাণ করার পরও এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিকের অবস্থা কী?
এই প্রশ্নের উত্তর নাঈম হাসান নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার জন্য বিসিবি কর্মকর্তা, ক্রীড়া সংগঠক এবং পরিচিতজনেরা এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জন্য তো কেউ থানায় ছুটে যাবে না। তাহলে প্রতিদিন কত মানুষ নীরবে অপমানিত হচ্ছে, কত মানুষ অন্যায়ের শিকার হচ্ছে, কত মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না—সেই হিসাব কে রাখছে?
এর আগেও আমি বহুবার বলেছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান শক্তি অস্ত্র নয়, জনগণের আস্থা। যে পুলিশ জনগণের বন্ধু হওয়ার কথা, সেই পুলিশ যদি ভয়ের প্রতীকে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ জনগণ তখন আইনকে নয়, ক্ষমতাকে ভয় পেতে শুরু করে। আর তখনই একটি সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গত দেড় দশকে পুলিশ বাহিনীর ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। সেই সময়ে পুলিশের একটি অংশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে বহুবার উঠেছে। বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো, হয়রানি, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—একটি দীর্ঘ সময়ে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক সংস্কৃতি কি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়? বাস্তবতা বলছে, যায় না।
কোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে পারে কয়েক ঘণ্টায়, কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে লাগে বহু বছর। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে গড়ে ওঠা মানসিকতা, ক্ষমতার চর্চা এবং আচরণগত ধারা সহজে বদলায় না। সংস্কার ছাড়া পরিবর্তন কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে কি এমন কোনো অংশ রয়েছে, যারা নতুন সরকারকে সফল দেখতে চায় না?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক পালাবদলের পর পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি নতুন বাস্তবতাকে সহজে মেনে নিতে পারেন না। তারা কখনো সচেতনভাবে, কখনো অসচেতনভাবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যা সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে। কারণ জনগণের ক্ষোভ বাড়লে সরকারই রাজনৈতিক মূল্য পরিশোধ করে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। কয়েকজন কর্মকর্তার আচরণের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীকে দোষারোপ করা অন্যায় হবে। বাংলাদেশের অসংখ্য পুলিশ সদস্য প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও তারা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু বেপরোয়া সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীর সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পুলিশ সংস্কারের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা। সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করলে দ্রুত তদন্ত হয়, সত্য প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। কারণ রাষ্ট্র জানে, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা হারিয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধুমাত্র প্রত্যাহার, ক্লোজড বা সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণ যথেষ্ট নয়। অভিযোগ সত্য হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করার সাহস না পায়।
নাঈম হাসানের ঘটনা কেবল একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কারও সমান জরুরি।
কারণ একটি সরকারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সবসময় বিরোধী দল নয়। অনেক সময় সেই ঝুঁকি তৈরি হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা অদক্ষতা, ঔদ্ধত্য, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতাহীনতার মাধ্যমে। ইতিহাসের অসংখ্য উদাহরণ প্রমাণ করে, বহু সরকার বিরোধীদের কারণে নয়, নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই জনগণের আস্থা হারিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই একটি মানবিক, গণমুখী এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে চান, তাহলে পুলিশ বাহিনীতে কার্যকর সংস্কার, মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই হবে। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হতে হবে সহযোগিতার, ভয়ের নয়; অংশীদারত্বের, প্রভুত্বের নয়।
নাঈম হাসানের ঘটনা তাই শুধু একটি সংবাদ নয়, একটি সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে ক্ষতি শুধু একজন নাগরিকের নয়, পুরো সরকারও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত সরকারের বিচার করে মাঠপর্যায়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আচরণ দিয়ে, কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আচরণ দিয়ে নয়।
তাই এখানে প্রশ্ন তোলা খুবই প্রাসঙ্গিক যে, এই পুলিশরা কি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে চাইছে, নাকি তাদের একটি অংশ চরম বিতর্কিত আচরণের মাধ্যমে জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়ে সরকারকে অজনপ্রিয় করে তুলছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু সরকারের রাজনৈতিক প্রয়োজনে নয়; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থেও অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com