আমি এবারের বাজেটকে ‘ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত’ বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা হিসেবে দেখি। এটি কেবল প্রচলিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের বাজেট নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণীত একটি ব্যতিক্রমী বাজেট।
গত কয়েক বছরের গতানুগতিক বাজেটের পর এবারের বাজেটকে আমি একটি ‘ক্যাচ-আপ বাজেট’ হিসেবে বিবেচনা করি। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। বৈশ্বিক যোগাযোগের এই যুগে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিক্ষার উদ্যোগও প্রশংসনীয়, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
অনেকে বাজেটকে অত্যধিক উচ্চাভিলাষী বলে মনে করলেও আমি সে মতের সঙ্গে একমত নই। অর্থনীতির চাকা যদি পূর্ণ সক্ষমতায় ঘুরতে পারে, তবে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মোটেও অসম্ভব নয়।
আবাসন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও করনীতিআমি সব সময়ই আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতকে করমুক্ত করার পক্ষে। কারণ আবাসন শুধু মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা পূরণ করে না; এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এই খাত সচল হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩,৬০০ সেবা ও উৎপাদনমুখী শিল্পখাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে গতিশীল হয়ে ওঠে।
আবাসন খাতে কর ছাড় দিলে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কিছু রাজস্ব হারাতে পারে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত লিংকেজ শিল্পগুলোর উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত রাজস্ব সৃষ্টি হবে, তা হারানো রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশের সিমেন্টশিল্প বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। এই হার যদি ৮০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে শুধু এই খাত থেকেই বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন সম্ভব। একইভাবে ইস্পাত, সিরামিক, রং, কেবল, ফিটিংস, লজিস্টিকস এবং ব্যাংকিং খাতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।
ঋণনির্ভরতা বনাম বৈশ্বিক ইক্যুইটি পুঁজিতবে বাজেটের একটি দুর্বলতা হলো এর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা। কেবল ঋণের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে এখন ঋণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে অবকাঠামো খাতে বিদেশি ইক্যুইটি বা অংশীদারি পুঁজি আকর্ষণের দিকে অধিক মনোযোগ দিতে হবে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় গন্তব্য। আমাদের মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে এই বৈশ্বিক তহবিলের একটি অংশ আকর্ষণ করা কেন সম্ভব হবে না?
সেজন্য এখন প্রয়োজন ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশি অংশীদারি পুঁজি আনার জন্য একটি সুস্পষ্ট ও কৌশলগত নীতি গ্রহণ।
পিভিসি শিল্প নিয়ে উদ্বেগতবে পিভিসি রেজিনের আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি আমাকে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের জন্য পিভিসিভিত্তিক পণ্য অন্যতম সম্ভাবনাময় মূল্যসংযোজনভিত্তিক রপ্তানি খাত। যথাযথ নীতিগত সহায়তা পেলে আগামী এক দশকের মধ্যে এই শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাতে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
নতুন করে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি শুধু এই রপ্তানি সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং দেশের ছোট শহরগুলোতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা শিল্প সম্প্রসারণকেও নিরুৎসাহিত করবে।
একই সঙ্গে এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বৃদ্ধিও বাস্তবতাসম্মত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে হয়েছে বলে মনে হয় না। আমার মতে, এটি সামগ্রিকভাবে প্রশংসনীয় বাজেটের একটি নেতিবাচক দিক। আমি এটিকে একটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করে বিষয়টি দ্রুত পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক:
চেয়ারম্যান, আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ