Friday | 19 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Friday | 19 June 2026 | Epaper
BREAKING: বগুড়ার সেই দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      দ্রুত সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন হবে ‘তিস্তা মেগা প্রকল্প’: পানি সম্পদ মন্ত্রী      ভালো দল না পেলে বিপিএল আয়োজন করবে না বিসিবি      পুলিশের পোশাকে আবার পরিবর্তন, প্রজ্ঞাপন জারি      লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ      হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু      আ'লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ‘শঙ্কা নেই’: ডিএমপি      

ক্রিকেটার নাঈমের ঘটনা এবং পুলিশ সংস্কারের অনিবার্য প্রশ্ন

প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৮:৫০ পিএম   (ভিজিট : ২৪)

জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে ঘিরে সম্প্রতি যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা শুধু একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং পুলিশ বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। একজন জাতীয় ক্রিকেটার অভিযোগ করেছেন যে, চট্টগ্রামে তাকে পুলিশ সদস্যরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন, মারধর করেছেন এবং পরিচয় দেওয়ার পরও তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘটনাকে কি আমরা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখব, নাকি এর ভেতরে আরও বড় কোনো সংকেত রয়েছে?

বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সাধারণ মানুষ যখন বিপদে পড়ে, অপরাধের শিকার হয় অথবা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন প্রথম যে প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকায়, সেটি হলো পুলিশ। পুলিশের ওপরই তারা ভরসা রাখে। ফলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা থাকা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যখন কোনো নাগরিক পুলিশের আচরণে অপমানিত হন, তখন শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি।

নাঈম হাসানের ঘটনাটি জনমনে এত আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মূলত একটি কারণে। তিনি একজন পরিচিত ক্রিকেটার। জাতীয় দলের জার্সি পরেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফলে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার খবর দ্রুত গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি একজন পরিচিত ব্যক্তি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাহলে প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে কী ঘটছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পুলিশি সংস্কৃতির দিকে তাকাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে একটি অভিযোগ প্রচলিত আছে যে, পুলিশের একটি অংশ ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আইন প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা কখনও কখনও বেশি দৃশ্যমান হয়। এটি শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।

বিশেষ করে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুলিশকে ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল দমন, রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। এসব বিতর্কের কারণে পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগও বহুবার উঠেছে।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা সরকারঘনিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে কাজ করেছেন অথবা প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত হয়েছেন, তাদের একটি অংশ এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব অবশ্যই তদন্ত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। তবে জনমনে এই ধারণা তৈরি হওয়াটাই একটি বড় সমস্যা। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো শাসনব্যবস্থার ওপর।

নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। আর সেই প্রক্রিয়ায় পুলিশ বাহিনী একটি কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করে আছে। কারণ জনগণ সরকারের কার্যকারিতা বিচার করে অনেক সময় পুলিশের আচরণ দেখে।

একজন পুলিশ সদস্য যখন একজন নাগরিকের সঙ্গে অসদাচরণ করেন, তখন সাধারণ মানুষ সেটিকে ব্যক্তিগত আচরণ হিসেবে দেখে না। তারা মনে করে, রাষ্ট্রই তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। ফলে পুলিশের কোনো সদস্যের ভুল আচরণ শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নাঈমের ঘটনাটি তাই সরকারের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। সরকার যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। কোনো ব্যক্তি পুলিশ সদস্য হলেই দায়মুক্তি পাবেন না। আবার কোনো নাগরিক পরিচিত বা বিখ্যাত হলেই কেবল বিচার পাবেন, এমন ধারণাও দূর করতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে পুলিশে শুদ্ধি অভিযান অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে শুদ্ধি অভিযান বলতে শুধু কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করাকে বোঝালে চলবে না। প্রয়োজন একটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়া। পুলিশ বাহিনীতে পেশাদারিত্ব, মানবাধিকারবোধ, নাগরিকবান্ধব আচরণ এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি ব্যাপক রিশ্যাফল বা পুনর্বিন্যাস। দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় থাকা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকা অথবা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। যোগ্যতা, সততা এবং পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন। পুলিশের সব সদস্যকে একই চোখে দেখা অন্যায় হবে। বাংলাদেশের অসংখ্য পুলিশ সদস্য অত্যন্ত কঠিন পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেন। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্যোগকালীন সহায়তায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছু সদস্যের আচরণ পুরো বাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ন করে দেয়।

এ কারণেই পুলিশের স্বার্থেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ একটি পেশাদার বাহিনী কখনোই চায় না যে, কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হোক।

নাঈম হাসানের ঘটনা আমাদের আরেকটি বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান শক্তি অস্ত্র নয়, জনগণের আস্থা। জনগণ যদি পুলিশকে বন্ধু হিসেবে দেখে, তাহলে অপরাধ দমন সহজ হয়। কিন্তু জনগণ যদি পুলিশকে ভয় পেতে শুরু করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও পেশাদার, আরও নিরপেক্ষ এবং আরও জবাবদিহিমূলক করে তোলার সুযোগ রয়েছে। নাঈমের ঘটনাটি সেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এটিকে কেবল একটি সাময়িক বিতর্ক হিসেবে দেখবে, নাকি একটি বড় সংস্কারের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করবে। যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং পুলিশ সংস্কারের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়, তাহলে এই ঘটনাটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ একটি আধুনিক, দক্ষ, পেশাদার এবং মানবিক পুলিশ বাহিনী চায়। নাঈম হাসানের ঘটনা সেই প্রত্যাশাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দায়িত্ব রাষ্ট্রের—সে প্রত্যাশার মর্যাদা দেওয়ার।

(লেখক—সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)





LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close