সমাজের দর্পণ হলো সাহিত্য। সমাজের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ পথরেখা—সবই আঁকা হয় সাহিত্যের ক্যানভাসে। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক—যত শাখা-প্রশাখায় ভাগ করি না কেন, মূল সুর কিন্তু একটাই—মানুষের মুক্তির পথে, সংগ্রামের পথে সাথী হওয়া।
নিত্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পথ চলে সমাজ তথা মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া-মিথস্ক্রিয়ার সম্মিলিত অস্তিত্ব। সমুদ্রের মতোই সাহিত্য ধারণ করে সকল স্রোতধারা; সবাই এসে মিলিত হয় এক মোহনায়; বহু বর্ণ, জাত, ধর্ম নিজ নিজ পতাকা উড়িয়ে শামিল হয় মহামিলনের মাঠে। এই যে উজান থেকে বয়ে আসে বহু বিচিত্র স্রোতধারা, প্রত্যেকেরই আছে নিজস্ব ঐতিহ্য, সৌন্দর্য, রত্নভাণ্ডার; সমস্ত রত্ন ও সৌন্দর্য জমা হয় সাহিত্যের গোলাঘরে। সাহিত্যের প্রস্ফুটন-প্রকাশের সকল দুয়ার তাই খোলা রাখতে হয় সর্বদা। এ দায়িত্ব সাহিত্যের নয়; সমাজের। সমাজ যদি হয় ধর্মীয় কিংবা জাতীয়তাবাদের উগ্র মৌলবাদী সংস্করণ, সেখানে ফোটে না সাহিত্যের ফুল; সকলই ধাবিত হয় অন্ধকার যুগে। আঁধার দূর করে আলোর পথে হাঁটা—সেই তো মুক্তির পথ; সাহিত্য বিকাশের বাধা এবং মুক্তির পথে বাধা একই। একসাথেই তাই ভাঙতে হবে বাধার দেয়াল, খুলে দিতে হবে মুক্তির স্রোত; ভালোবাসার ফসলের নৌকা নির্ভয়ে চলবে মুক্তির পতাকা উড়িয়ে।
পৃথিবীর কোথাও শেষ হয়নি মুক্তির সংগ্রাম; কেননা মুক্তি তো নয় এককালীন সাফল্য অর্জন। মুক্তিকে সর্বদা বয়ে চলতে হয় স্বচ্ছ সলিলধারা বুকে নিয়ে রঙিন স্বপ্ন। স্বপ্নের রসদ জোগায় সাহিত্য; গল্প কানে কানে বলে ডাইনি বুড়ির উপকথা; কবিতা আসে আবেগের জোয়ার নিয়ে—প্রবল সাহসের ঢেউয়ে দোলায়, দোলাতে চায় সকলকে; নাটক চিত্রায়িত করে সকল দ্বান্দ্বিক চরিত্র, নায়ক-খলনায়কের ভূমিকা; প্রবন্ধে রচিত হয় মুক্ত সমাজের ভিত। সাহিত্য তাই মুক্তির সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, মুক্তির মিছিলে পদযাত্রী। যে জাতি বা সমাজ বা রাষ্ট্র মুক্তি চায়, স্বাধীনতার ফুল ফোটাতে চায়, সুগন্ধ বিলাতে চায়, সৌন্দর্য ছড়াতে চায়—সে জাতি, গোষ্ঠী, সমাজ, রাষ্ট্র অবশ্যই পূর্ণ স্বাধীনতায় খুলে দেবে সহস্র দুয়ার। সাহিত্যের আছে ঐন্দ্রজালিক শক্তি—সমস্ত বাধার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায় জলের ধারা; ডিঙাতে না পারলে ভেতরপথে চলে; সে মানে না কোনো নিষেধ। জলের শাশ্বত প্রবাহ যেমন, মুক্তিও তেমনি মানুষের স্বতঃপ্রণোদিত ইচ্ছার অনাবিল প্রবাহ।
সাহিত্যের সকল শাখা-প্রশাখা সমৃদ্ধ করে মুক্তির সংগ্রামের সকল স্রোতধারা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে, একাত্তরে, মুক্তির গান, বিদ্রোহী কবিতা, মনের আকুতি-ভরা জারিগান, পালাগান—সকলেই জুগিয়েছে যুদ্ধাস্ত্রসম সাহস। যুদ্ধের পটভূমিতে বৈষম্যের চিত্র, মুক্তির সকল বাধা চিত্রায়িত করেছে ছাত্র, তরুণ, অধ্যাপক, গবেষকদল; তারা সকলেই সাহিত্যের সৈনিক। তাই মুক্তির সৈনিক মেধা-মনন, চিন্তা-চেতনায় সবসময় চায় সকলের জন্য সমান অধিকার—মুক্ত বাতাসে মুক্তির নিঃশ্বাস। মুক্তির পথে সকল সৈনিককে সাহস জোগায়, কীর্তিমান করে তোলে, নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামে শামিল করে সৃষ্টিশীল সাহিত্য, যার একমাত্র লক্ষ্য মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সাহিত্য সত্য কথা বলে, সত্যের পথ দেখায়; অবশ্য ফরমায়েশি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস সত্যকে আড়ালে রেখে রচনা করে স্তুতিবাক্যের রঙিন ফানুস। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো মুক্তির পথে বাধার দেয়াল সৃষ্টি করে শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্যের স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। সে ফানুসের চরিত্রও কিন্তু উন্মোচন করে মূলধারার সাহিত্য; প্রবহমান সমাজের স্থিরচিত্র ধারণ করে এ সাহিত্য; চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় সকল অসংগতি, ক্ষমতাবলয়ের সকল সবল ও দুর্বল চিত্র; মুক্তির সংগ্রামের গতিধারা প্রবাহিত হয় সঠিক নিশানায়।
যে গোষ্ঠী বা সমাজ বা রাষ্ট্র সাহিত্যে যত বেশি সমৃদ্ধ, মুক্তির সংগ্রামে সে তত বেশি অগ্রগামী। কেবল বিপ্লবী সংগঠন কিংবা তার শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা মুক্তির পথের নিশ্চয়তা দেয় না; মুক্তির বিষয়টি আসলে সামগ্রিক, পরস্পর-সংযুক্ত অথচ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অস্তিত্বের মহামিলনমঞ্চ। এ মঞ্চকে সত্যের সৌন্দর্যে সাজাতে পারে একমাত্র স্বাধীন সাহিত্যকর্ম। আমরা যদি মানুষের ইতিহাসে বড় বড় পরিবর্তনগুলোর দিকে তাকাই, বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করি—ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (দাসপ্রথার বিরুদ্ধে মানবতার জয়), অক্টোবর বিপ্লব, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে এশিয়া-আফ্রিকার সংগ্রাম, চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—একটি মূল সূত্র খুঁজে পাই যে, মানুষের সম্মিলিত সাধারণ একটি স্বপ্ন থাকে, যাকে বলি শিকল ভাঙার স্বপ্ন, পথচলার স্বপ্ন, নিজেদের ভাগ্যকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার স্বপ্ন। এ মৌল স্বপ্নকে যে গড়ে, যে সাজায় আত্মার রঙে—সে হলো সাহিত্য।
সাহিত্য ছাড়া চেতনা ধারালো হয় না, দ্যুতি ছড়ায় না; সাহিত্যের স্বাধীন, শক্ত কাঠামো ছাড়া মুক্তিসংগ্রামের ভিত শক্তিশালী হয় না। আবার মুক্তিসংগ্রামের শক্ত ভিত ছাড়া মুক্তির স্বপ্ন ছোঁয়া যায় না—সে হয়ে যায় সারশূন্য ফানুস। সাহিত্যের অনন্ত সৃষ্টিধারার মধ্য দিয়েই পথ খুঁজে পায় মুক্তির মহানায়কেরা; মুক্তির সৈনিকেরা অনাবিল বিশ্বাসে হাসতে হাসতে সঁপে দেয় জীবন, বিসর্জন দেয় নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া—সবকিছুই করে মুক্তির তরে।
কবি ও প্রাবন্ধিক
(লেখকের ‘মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর’ গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত)