“মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী”—মহাবিশ্বের অন্যান্য প্রাণী ও জীবজগতের সব অস্তিত্বের তুলনায় মানুষের রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। বুদ্ধির সব উপাদান, আচার-অনুষ্ঠান ও ক্রিয়াকলাপ মানুষের এই স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যকে বিকশিত করে।
বুদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার রয়েছে নিবিড় বন্ধন, অবিচ্ছেদ্য নাড়ির টান। বিরান ভূমিতে শস্য জন্মায় না; গাছে গাছে পাখির কলকাকলিতে ভরে ওঠে না সুমধুর সকাল। সকল মানুষেরই বুদ্ধি আছে; এমনকি যাদের আমরা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বলি, তাদেরও রয়েছে অন্যভাবে খোলা জানালা। মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার পথে শিক্ষার বিকল্প আজও আবিষ্কৃত হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি রোবট মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ও কাজ করে দিতে পারে; কিন্তু তা মানুষের বিকল্প হতে পারে না। সত্যিকারের মানুষ মানবিক হৃদয় ধারণ করবে তার সকল কর্মের কেন্দ্রে। এই মানবিক হৃদয় গঠনে শিক্ষার ভূমিকা কেন্দ্রে, মূলে এবং অস্তিত্বের বিকাশে।
কী শিখব আমরা? অ আ ক খ বা A B C D বর্ণমালা, ১, ২, ৩ বা 1, 2, 3—গাণিতিক চিহ্নমালা? নাকি শিখব বহু বৈচিত্র্যের মাঝে একক ব্যাকরণ, যা আমাদের নিয়ে যাবে প্রকৃত মুক্তির পথে? এখানে একটু থামতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে—কোন দিকে যাব? কে দেবে পথনির্দেশ?
এখানে তাকাতে হবে নিজের দিকে, নিজের অস্তিত্বের ইতিহাসের দিকে, অতীতের অমূল্য স্মৃতিসম্ভারের দিকে। সেগুলোই বলে দেবে বর্তমান কর্মপন্থা, কর্মযজ্ঞের সমাহার, যা নির্ধারণ করবে মুক্তির গতিপথ—হোক না তা আঁকাবাঁকা, চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। তবে একটি মূলসূত্র মানতেই হবে—শিক্ষাদর্শন স্পষ্ট না হলে সকল কর্মযজ্ঞ ও আয়োজন নিষ্ফল হবে।
শিক্ষাদর্শনের ভিত্তি কী হবে? পলিমাটির সৌরভে সকল ফুল ফুটতে দাও, নাকি কাঠামোবদ্ধ সামষ্টিক সুফলের প্রত্যাশায় থাকব? ব্যক্তির যোজিত সত্তা সমষ্টি বা সমাজ বা রাষ্ট্র হলেও ব্যক্তির অস্তিত্ব কখনো নাশ হয় না সামষ্টিক অস্তিত্বে; দ্বন্দ্বটা এখানেই—ব্যক্তি বনাম সংঘ, রাষ্ট্র, সমাজ বা বৈশ্বিক সংগঠনের মধ্যে।
এই দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটিয়ে সকল অস্তিত্বের বিকাশের পথে বাধাহীন উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করাই হবে আমাদের শিক্ষাদর্শন। এ পথ সহজ নয়; বাধা আসবে পর্বতসম। এমনকি তরবারির আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড হতে পারে দেহ-মস্তক, বিচ্ছিন্ন মরুভূমিতে পড়ে থাকতে পারে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এই বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে লড়তে হলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে প্রস্তুতি থাকতে হবে।
প্রাথমিক স্তরে থাকবে মা, মাটি ও দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। প্রস্তুতি পর্বে শিখতে হবে ভাষার ব্যাকরণ, যুক্তির লালিত নিয়ম-কানুন, গাণিতিক নিয়ম এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি। উচ্চশিক্ষা হবে উদার হৃদয়ে সকলকে ধারণ করে ঋদ্ধ হওয়ার উন্মুক্ত ক্ষেত্র—সমুদ্রের মতো।
তবে মনে রাখতে হবে, সমুদ্রেরও আছে নিজস্ব সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য; বায়ুর ঘূর্ণিপ্রবাহেও লুকিয়ে থাকে অনুপম বৃত্তের সৌন্দর্য। পৃথিবীর সকল প্রাণেরই আছে স্বাধীন ও স্বকীয় বাস্তুস্থান। সকল স্বকীয়তার স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার অঙ্গীকার থাকবে মানুষের শিক্ষাদর্শনের মূলে। তারপর বিকশিত হবে সবুজ কচি পাতা, ডালপালা, রঙিন ফুল-ফল ও প্রজাপতি। মানুষ নিঃসংকোচে মিশবে উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের সকল অস্তিত্বের সঙ্গে।
এ ক্ষেত্রে জাগে চিরায়ত প্রশ্ন—খাদ্যশৃঙ্খলের প্রাকৃতিক নিয়ম যদি বহাল থাকে, তবে কীভাবে মিলবে সকল প্রাণ একে অপরের সঙ্গে? এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে বুদ্ধিবৃত্তির উত্তম চর্চার মধ্যে।
সৃষ্টিকর্তার জাদুকরী দান মানুষকে দিয়েছে বুদ্ধির চর্চার অবাধ স্বাধীনতা, আর এটাই মানুষের একমাত্র প্রকৃত স্বাধীনতা। সকল মানুষের সংহতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত ফল পৃথিবীর জন্য বয়ে আনবে অসীম ধারণক্ষমতা—পরিমাণগত ও গুণগত উভয় দিক থেকেই বৈচিত্র্যময়।
তবে একটি নিয়ম সকলকেই মানতে হবে—ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মমত্ববোধই হবে আমাদের নিয়ামক শক্তি।
মানুষের মুক্তির পথে সবচেয়ে কার্যকর ও জাদুকরী উপায় হলো নিজে শিক্ষিত হওয়া, অন্যকে শিক্ষাগ্রহণে সহায়তা করা এবং শিক্ষার সামগ্রিক জ্ঞানভাণ্ডারকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা।
সকল প্রকার শৃঙ্খল বা শিকল ছিঁড়ে মুক্তির পথে চলার প্রধান পাথেয় হলো শিক্ষা। শিক্ষা এমনই জাদুকরী শক্তি, যা একটি শাখা-প্রশাখা থেকে জন্ম নিয়ে উন্মুক্ত করতে পারে হাজারো পথের দ্বার। তবে এই শক্তি যেমন গঠন করতে পারে, তেমনি ধ্বংসও করতে পারে। তাই শিক্ষার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকতে হবে মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সর্বজনকল্যাণের নির্দেশনা।
ব্যক্তিমানুষের স্বাতন্ত্র্য যেমন সত্য, তেমনি সামষ্টিক বা যৌথ অস্তিত্ব ছাড়া ব্যক্তিগত অস্তিত্বও যে মূলহীন—এটিও সমান সত্য। এই দ্বৈত সত্যকে সামনে রেখেই প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও সামর্থ্যের পাথেয় হবে শিক্ষাব্যবস্থা।
শিক্ষার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, নেই কোনো সীমান্ত-পিলার। মুক্তির পথচলায়ও নেই থেমে যাওয়ার কোনো আশ্রয়। শিক্ষা ও মুক্তি একসঙ্গে হাত ধরে চলেছে, চলছে এবং চলবে নিরন্তর সংগ্রামের পথে।
কবি ও প্রাবন্ধিক
(লেখকের ‘মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর’ গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত)