Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      মিয়ানমারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৫৫      

অর্থ ও মুক্তি

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬:৪০ পিএম   (ভিজিট : ৩০৩)

অর্থকে স্বাভাবিকভাবে আমরা বুঝি টাকা-কড়ি, ধন-সম্পত্তি। তাকে দ্বিতীয় ঈশ্বর বলে অভিহিত করাটা এখন প্রায় সর্বজনবিদিত। প্রথম ঈশ্বরকে যদি বলি সৃষ্টিকর্তা—অবশ্যই ধর্মীয় বিশ্বাসের অভিধানে ঈশ্বরের কোনো শরিক বা ভার্সন নেই। আমিও মনে-প্রাণে, কাজে-কর্মে তা-ই বিশ্বাস করি এবং সে মতে কর্ম করি। নিতান্তই লৌকিক অর্থে দ্বিতীয় ঈশ্বর আপেক্ষিক বিচারে বেশি ক্ষমতাধর, শক্তিধর। ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে আদেশের কার্যকারিতায়। অর্থের আছে জাদুকরী ক্ষমতা; সে সকলকে যেমন খুশি পুতুলের মতো নাচাতে পারে। অর্থকে আদেশের সমার্থকও ভাবতে পারি, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদেশের সঙ্গে অর্থের সংশ্লেষ নেই। তবে মানুষের জীবন, বিশেষ করে আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায়, আর্থিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কোনো কর্ম ঘটে না; এমনকি সমাজ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডও নয়। অর্থাৎ অর্থ ছাড়া বর্তমান জীবন-সংসার সম্পূর্ণভাবেই অচল।

শুরুতে অর্থ ছিল নিতান্তই বিনিময়ের মাধ্যম। অর্থাৎ বহুসংখ্যক মানুষের চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয় সাধন তথা চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করত মুদ্রা। অর্থ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকে; তাকে আবার সাধারণ মাপকাঠির চরিত্রও ধারণ করতে হয়, যাকে আমরা বলি হিসাবের একক। সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য একক হিসেবে অর্থের ভূমিকার সত্যিই কোনো তুলনা নেই। জীবনের যত লেনদেন, যত জটিল অঙ্ক—অর্থের হিসাবে সব হবে সমাধান ‘জলবৎ তরলং’। তারল্য তাই অর্থের প্রধান মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তরল পদার্থ আর অর্থের চরিত্র প্রায় হুবহু এক। তাই তো অর্থকে নড়াচড়া করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়; সতর্কতা তাই আর্থিক ব্যবস্থাপনার মূলে বিরাজ করে। জলকে ধরে রাখতে হয় মাটির পাত্রে কিংবা পুকুরে, খালে বা নদীতে (এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নদীকে শাসনে রাখতে হয়)। অর্থাৎ অর্থকে মূল্য ধরে রাখার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বিপত্তির শুরুটাও হয় এখান থেকেই।

মানুষের স্বাভাবিক জীবনক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত সংগঠিত হয় অগণিত আদেশের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার আবেশ। বায়ুপ্রবাহ বা জলপ্রবাহের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা লেনদেনের যোগফল শূন্য হয়; একদিকের ঘাটতি অন্যদিকের উদ্বৃত্ত পরস্পর স্থানবিনিময় করে কালে এসে স্থিতি হয়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বাঁধ দিয়েই ঘটানো হয় যত বিপত্তি, ঝগড়া-ফ্যাসাদ-দ্বন্দ্ব। প্রত্যেক মানুষ শক্তির আধার—এ শক্তির প্রকাশ ঘটে আদেশের মাধ্যমে।

এ আদেশের বাহন হচ্ছে অর্থ। বাহন নিজে নিজে চলে না; এমনকি স্বয়ংক্রিয় বাহনকেও চালায় অদৃশ্য বুদ্ধিমত্তার সুবিন্যস্ত কাঠামো, যাকে আমরা বলি প্রোগ্রামিং। অর্থাৎ শক্তি বা ক্ষমতা মেনে চলে কারো না কারো নির্দেশ—দৃশ্যমান বা অদৃশ্য। চূড়ান্ত বিচারে আমরা তাই অর্থকে বলতে পারি আদেশের আকর। অর্থের সঙ্গে আবার মূল্যের আছে নাড়ির সংযোগ; একজনকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে অপরজন হয়ে পড়ে মৃত। মূল্য আবার পুরোপুরিই ব্যক্তিনির্ভর সত্তা। এক ব্যক্তি যাকে দেয় ব্রাহ্মণের মর্যাদা, অন্য ব্যক্তি তাকে মনে করতে পারে নিতান্ত খড়কুটো। সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বব্যবস্থা—সে তো লক্ষ-কোটি ব্যক্তির চাওয়া-পাওয়ার নিত্যঘটিত কার্যের সমাহার। বহুত্ব এবং বৈচিত্র্য মানবসমাজের ধর্ম। এটি আবার সকল প্রকার জীবের ইকোসিস্টেমেরও সত্য রূপ। মূল কথা এই যে, বহুত্ব এবং বৈচিত্র্য জীবন চলার সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

সাধারণকে বাদ দিয়ে কিংবা উপেক্ষা করে বিশেষের অস্তিত্ব টেকে না।

আবার ব্যক্তিমানুষের স্বাভাবিক জৈবিক বা মৌল প্রবণতা হচ্ছে সমস্ত শক্তিকে একটি বিন্দুতে, কিংবা বিন্দুর সঙ্গে বিন্দু জোড়া দিয়ে রেখায় আবদ্ধ করা। মানুষের এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা জৈবিক প্রবণতাকে নিয়মে বেঁধে ক্ষমতার তরলীকরণ করার জন্যই কালের সঙ্গে হয়েছে সমাজের বিবর্তন, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন—সর্বোপরি বৈশ্বিক ব্যবস্থার ধরন-ধারণ-রূপ বদলে সৃষ্টি করেছে যুগের ধারা। মানুষ একক সত্তা হলেও তার বেঁচে থাকা কিংবা জীবনযাপন প্রক্রিয়া পরস্পরনির্ভরশীল। সমাজজীবনের নির্ভরশীলতার এ বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগিয়ে দুর্জনেরা দখল করেছে ক্ষমতা, জারি করেছে স্বৈরচারী একচেটিয়া আদেশ। মুদ্রাব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে এ আদেশের কার্যক্রম।

কোনো দেশ বা জাতিগোষ্ঠীর সার্বভৌম আদেশের প্রতীক হচ্ছে মুদ্রা, অর্থ বা টাকাকড়ি। অর্থাৎ অর্থের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, যদিও আমরা আপাতদৃষ্টিতে বা দৃষ্টিভ্রমে তাকে মনে করি চরম ক্ষমতাধর বস্তু। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনো সত্তা চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতা সৃষ্টি করে না বা তার অধিকারীও হয় না। একক মানুষ তথা সমাজের বাসিন্দা বা রাষ্ট্রের নাগরিক একসঙ্গে মিলে তাদের যোজিত ক্ষমতা যখন অর্পণ করে কোনো সংগঠনকে—তা হতে পারে গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ, আধুনিক রাষ্ট্র কিংবা বৈশ্বিক সংস্থা বা সংঘ—সেই তখন ধারণ করে সার্বভৌম ক্ষমতা। এই সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ মর্যাদা নিয়ে অর্থ শাসন করে সকল কর্মকাণ্ড। ধারণাগতভাবে এক সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে অপরের সার্বভৌম অধিকারকে। এ নিয়মের যখন ব্যত্যয় ঘটে, তখনই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত-অস্থিরতা।

যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থব্যবস্থার একক শক্তি হিসেবে চালু করা এবং তাকে যুগের পর যুগ টিকিয়ে রাখার নানাবিধ কূটকৌশল গ্রহণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বসংকট। ডলারের চাহিদা-সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা। এ ক্ষমতার মালিক মার্কিন জনগোষ্ঠী। বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্রের নাগরিক এর অংশীদার নয়। তাদের কোনো বক্তব্য নেই; তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন এতে নেই।

বিশ্বের সকল রাষ্ট্র মিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সার্বভৌম ক্ষমতা অর্পণ করেনি; কেবল কূটচাল এবং সমরশক্তির বলে, কিংবা গায়ের জোরে তারা চালিয়ে যাচ্ছে এ ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা বিশ্বের সকল মানুষের চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দের কোনো মূল্য দেয় না। শুধু তা-ই নয়, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও কেন্দ্রীভূতকরণের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বৈষম্যের ব্যপ্তি ও তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে শুরু হয়ে একবিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে বিশ্বায়নের প্রবল ধারা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর বাহাদুরি, বিশেষ করে অর্থ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, অনেকটাই নির্জীব করে দেয়। কিন্তু দুই হাজার বিশ সাল থেকে বিশ্বধারার এ স্রোতকে উল্টো দিকে নিয়ে যেতে সর্বপ্রকার প্রস্তুতি নিয়ে যুদ্ধে নামে যুক্তরাষ্ট্র। উদ্দেশ্য একটাই—তার প্রভুত্বকে টিকিয়ে রাখতেই হবে। এর প্রধান দুটি পন্থা—ডলার সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিশালীকরণ এবং যুদ্ধের অর্থনীতি তথা সমরাস্ত্রের রমরমা বাজার সৃষ্টি করা।

আমাদের সমাজে অর্থকে সকল অনর্থের মূল বলে ধিক্কার দিই; কেননা অর্থ কেন্দ্রীভূত হলে কেন্দ্রীভূত হয় ক্ষমতা, যা বোমার চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। মানুষ চায় এ সমস্ত অন্যায়-অবিচার এবং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে। সে চায় তার বহু বিচিত্র ইচ্ছা নিয়ে একসঙ্গে বেঁচে থাকার আবাস।

মুক্তির পথে বর্তমান অর্থব্যবস্থা একটি প্রধান বাধা। মানুষে মানুষে যোগাযোগ ও পরস্পরনির্ভরশীলতার বিনিময়কে অবশ্যই সহজ ও তরলীকরণ করতে হবে, যাতে ক্ষমতা দানা বাঁধতে না পারে একক কোনো হাতে। অর্থের ভূমিকাকে তাই পুনর্মূল্যায়ন করে এর বিকল্প উদ্ভাবন করতে হবে। ডলার সাম্রাজ্যবাদ বা অন্য কোনো একক মুদ্রার আধিপত্য নিশ্চিহ্ন করতেই হবে। চালু করতে হবে বিশ্বমুদ্রা, যা সাধারণ নিয়মে সকল মানুষের কল্যাণে বহুত্ব ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করবে এবং মানুষের আন্তঃযোগাযোগকে সহজতর করে সৃষ্টি করবে কল্যাণকর বিশ্বব্যবস্থা—যেখানে সকল মানুষ নিতে পারবে মুক্তির নিঃশ্বাস। এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সইতে হবে বিরাজমান ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার কষ্ট-সংকট। অসীম ধৈর্য নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে হবে বিশ্বের সকল মুক্তিকামী মানুষকে একসঙ্গে।

মনিরুজ্জামান বাদল
কবি ও প্রাবন্ধিক
(লেখকের ‘মুক্তির সংগ্রাম নিরন্তর’ গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত)

আরএন




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close