অনলাইন জুয়া ও বেটিংসহ বিভিন্ন ধরনের জুয়া সংশ্লিষ্ট অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল–২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে বিরোধী দলের সদস্যরা জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে প্রেরণ এবং সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে এসব প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নিষ্পত্তি করে বিলটি পাস করা হয়। ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ রহিত করে নতুন এ আইন কার্যকর করা হচ্ছে।
বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
অনলাইন জুয়া পরিচালনা বা এতে সম্পৃক্ত হলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বেটিংয়ে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড বা ৫ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
এছাড়া ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
পাস হওয়া আইনে অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, জুয়ার সহায়তা, বিজ্ঞাপন প্রদানসহ মোট ২৪ ধরনের কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ১৪ ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। অনলাইনে জুয়া খেলা, পরিচালনা, সহায়তা বা প্রচার—সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
বিলের আলোচনা
বিলের আলোচনায় স্বতন্ত্র এমপি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, অনলাইন জুয়ায় শিশুরাও আকৃষ্ট হচ্ছে, বাবা-মায়ের টাকা খোয়াচ্ছে। তাই আইনটি আরও কঠিন করার প্রস্তাব করেন তিনি।
রংপুর-৪ আসনের এমপি আখতার হোসেন বলেন, বিলের উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি একমত। তবে কয়েকটি ধারায় ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কা আছে। তিনি তল্লাশি, জব্দ, জুয়ার স্থান সিলগালা, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন ও আইপি অ্যাড্রেস ব্লক করার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া এসব ক্ষমতা দিলে তা নাগরিক অধিকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এমপি আখতার হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জুয়া প্রতিরোধের কথা বলে সরকারের সমালোচনাকারী কোনো ওয়েবসাইট, নিউজ পোর্টাল বা ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শুরুতে অনলাইন অপরাধ দমনের কথা বলা হলেও পরে সেই আইন রাজনৈতিক বিরোধী মত দমনে ব্যবহার করা হয়েছিল।
আখতার হোসেনের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন জুয়া সাইবার স্পেস, অনলাইন ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হয়। আদালতের অনুমতি নিতে গেলে অপরাধের আলামত বা স্থান দ্রুত সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে।
তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন আইনে পুলিশের তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে; এই বিলেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, এই আইনে পুলিশকে একেবারে “আনকন্ডিশনাল” ক্ষমতা দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিলের বিদ্যমান ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আইনটি যুগোপযোগী হলেও অপব্যবহার ঠেকাতে জব্দের পর দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করা উচিত।
জুয়া প্রতিরোধ বিল পাশের পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আইনটির পক্ষে আমরা। সরকারের প্রতি সাধুবাদও জানিয়েছি। কিছু সুনির্দিষ্ট ধারায় বিরোধী দলের সংশোধনী ছিল, সেগুলো সরকার সেগুলো গ্রহণ করলে আমরা খুশি মনে, আরও সাদরে সমর্থন করতে পারতাম। আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ না হয় সে দিকে খেয়াল রাখেন। আইনটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে।
এসআর