বিমানের পাশের সিটে বসা এক আমেরিকান ভদ্রলোক বলছিলেন, স্ট্যাচু অব লিবার্টির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকলে নাকি তার নীরব ভাষাও বোঝা যায়। নিউইয়র্কে পা রাখার পর এখনও যাওয়া হয়নি হাডসন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঐতিহাসিক ভাস্কর্যের কাছে। তবে মনে হচ্ছে, সেখানে গেলে হয়তো ফুটবল বিশ্বকাপের নতুন এক গল্পও খুঁজে পাওয়া যাবে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অভিবাসী, পর্যটক ও স্বপ্নবাজ মানুষকে স্বাগত জানিয়েছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। এবার হয়তো তার মশালের আলোয় স্বাগত জানানো হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব—ফিফা বিশ্বকাপকেও।
তবে আপাতত নিউইয়র্কের ব্যস্ততা বিশ্বকাপের আবহ খুব একটা প্রকাশ করছে না। জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের করিডোরে নিউইয়র্ক পর্যটন কর্তৃপক্ষের ‘যেখানে খেলতে আসে সারা বিশ্ব’ স্লোগানটি চোখে পড়লেও বিশ্বকাপের রঙিন সাজসজ্জা এখনও তেমন দৃশ্যমান নয়।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপের প্রকৃত উত্তাপ এখন অনুভূত হচ্ছে মেক্সিকো সিটিতে। উদ্বোধনী ম্যাচকে ঘিরে সেখানে বইছে উৎসবের আমেজ। স্বাগতিক মেক্সিকো আজ মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। ম্যাচকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশার আবহ।
ফিফার মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনী আয়োজনকে স্মরণীয় করে তুলতে ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে থাকছে জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রায় ৮৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই ভেন্যুতে পারফর্ম করবেন বিশ্বখ্যাত শিল্পী শাকিরা ও বার্না বয়। তাদের সঙ্গে থাকছে মেক্সিকোর গ্র্যামিজয়ী কিংবদন্তি রক ব্যান্ড মানা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও বিশেষ স্থান দখল করে আছে এস্তাদিও আজতেকা। উত্তর আমেরিকার তিন স্বাগতিক দেশের মধ্যে ফুটবল ঐতিহ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ মেক্সিকো। আর সেই ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক এই স্টেডিয়াম, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের দুই কিংবদন্তি পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছিলেন।
বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হচ্ছে মেক্সিকো থেকে, আর সেই সঙ্গে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দনও যেন বাড়ছে প্রতিটি মুহূর্তে। উত্তর আমেরিকার মাটিতে আয়োজিত এই আসরে ফুটবলের নতুন ইতিহাস রচনার অপেক্ষায় এখন গোটা বিশ্ব।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের এই একটিই মাঠ শুধু দাবি করতে পারে তিন তিনটি বিশ্বকাপের (১৯৭০, ১৯৮৬ আর ২০২৬) উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের একক কীর্তি গড়েছে। পড়শি দেশের এই অহঙ্কারের জায়গায় হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ভাগ বসাতে পারবে না। তাই বলে ট্রাম্পের দেশ পিছিয়ে থাকবে, কক্ষনো না। এক দিন বাদেই হলিউডের ভাইব নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে যুক্তরাষ্ট্রেও তারার মেলা বসছে। যেখানে স্বাগতিকরা প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ের। কেটি পেরি থেকে টাইলা, বাস্কেটবল তারকা লেব্রন জেমস থেকে হলিউডের হিউ জ্যাকম্যান আলো ছড়াতে সবাই হাজির হবেন সোফাই স্টেডিয়ামে।
আসলে আমেরিকা বরাবরই বড় জিনিসের ভক্ত। আকাশছোঁয়া বহুতল ভবন, বিশ্ব কাঁপানো সবচেয়ে বড় অর্থনীতি, সবচেয়ে বড় সাবওয়ে, সবচেয়ে বড় শপিংমল–সেখানে ফুটবলইবা কেন বিশালতা ছাড়াবে না। সে কারণেই বুঝি এই প্রথমবার ৪৮ দলকে নিয়ে বিশ্বকাপ, তিনটি দেশের ১৬টি স্টেডিয়ামে ১০৪টি ম্যাচ। আড়াইশ বছরের বুড়ো দেশটিকে ছাব্বিশের তরুণীর রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েই বুঝি ফুটবল এবার আটলান্টিক তীরে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান যখন দেশের অর্থনীতিতে জোর দিচ্ছে, ফুটবল তখন এই দেশে ‘ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট’ আবেগ নিয়ে হাজির হয়েছে। উবার চালকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য–কুইন্সের জ্যামাইকা পাড়া থেকে ব্রুকলিনের লাতিনো গলি–একটু একটু করে নাকি আমেরিকানরাও বুঝে নিচ্ছে আদতে তাদের খেলা সকার-ই বিশ্বের কাছে ফুটবল। এই খেলাটির সর্বজনীন ভাষাটাই বুঝি অনুবাদ করতে যাচ্ছে নিউইয়র্ক।
যদিও এই শহরে নয়, বিশ্বকাপের খেলা সব নিউজার্সিতে। দেড় ঘণ্টার মোটর ড্রাইভ–ট্রেনে গেলে কয়েকবার স্টেশন বদল করতে হয়। ব্রাজিল দলও তাদের বেস ক্যাম্প করেছে সেই নিউজার্সিতেই। নিউইয়র্ক বুলসের ৮০ একরের খোলামেলা পরিবেশেই অনুশীলন করছেন নেইমাররা। এখানকার মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই শনিবার (বাংলাদেশ সময় রোববার) প্রথম ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। সেদিনই হয়তো নিউইয়র্ক ছন্দ তুলবে সাম্বার।
এসআর