মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে চরম ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি খাত। জ্বালানি তেলের জন্য দেশজুড়ে চলছে হাহাকার। পোহাতে হচ্ছে অন্তহীন দুর্ভোগ। জ্বালানি তেলের জন্য পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। তেলের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি বন্ধ হচ্ছে না। নতুন করে দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। জ্বালানি তেলের দামের উল্লম্ফন আরও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে। বাজারদরে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব, যা উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতির পারদও। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে বড় এক চ্যালেঞ্জ। কঠিন এমন বাস্তবতার মধ্যেই দেশের কাঠামোগত বড় ধরনের এক দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এনেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরেও দেশে প্রয়োজনীয় সক্ষমতার আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন তেল পরিশোধনাগার স্থাপন করতে পারেনি কোনো সরকারই। এখন পর্যন্ত বন্দর নগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রায় ৬১ বছর আগে স্থাপিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডই দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার। ইআরএল-এর বার্ষিক শোধনক্ষমতা ১৫ লাখ টন। প্রায় ৭০ লাখ টন থেকে ১ কোটি টন সক্ষমতার আরেকটি তেল পরিশোধনাগার প্রতিষ্ঠার বদলে বিগত সরকারগুলোর নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা না থাকলে সরকারের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি সম্ভাবনার সিংহদ্বার খুলতো। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সক্ষম করতে নতুন জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সেনাপ্রধান।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে (এনডিসি) ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পার হলেও দেশে দ্বিতীয় কোনো জ্বালানি তেল শোধনাগার (রিফাইনারি) গড়ে না ওঠায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধে সৃষ্ট সংকট সমাধানে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন এই চার তারকা জেনারেল। তিনি বলেছেন, ‘জ্বালানি সক্ষমতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট। নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় অপরিশোধিত তেল থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যার ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ছে।’
দেশে বর্তমানে বছরে পরিশোধিত-অপরিশোধিত মিলে প্রায় ৯০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় তেলের দাম বাড়ে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি বার্ষিক চাহিদার ২০ শতাংশ জ্বালানি তেলের জোগান দেয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি করে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। বাকি পরিশোধিত তেল আমদানিতে সরকারকে লাখ লাখ ডলার গুনতে হয়। এর বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ডিজেল, যা মোট সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
উদ্বেগের বিষয়, দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির আয়ু শেষ হয়েছে দুই দশক আগে। নিয়মিত তেমন সংস্কার হয়নি। কম দক্ষতায় এখানে চলেছে পরিশোধন কার্যক্রম। তেল পরিশোধনে রাষ্ট্রীয় রিফাইনারির কোনো রকম সক্ষমতা বাড়েনি। সেই সঙ্গে কৌশলগত জরুরি এ পণ্যের মজুত সক্ষমতাও বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এরই মধ্যে ক’দিন আগে ইস্টার্ন রিফাইনারি কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাস্তবে এটি বন্ধ হয়নি বরং লো-ফিডে বা সীমিত উৎপাদনে এটি চালু আছে বলে জানান জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী।
ইস্টার্ন রিফাইনারির চলমান অবস্থার হালহকিকতও উঠে আসে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির উন্নতি বা সম্প্রসারণ আমরা করতে পারিনি। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে বর্তমান যে উত্তেজনা, তা থেকে বোঝা যায় জ্বালানি সংকট কীভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।’ সময়মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সক্ষমতা অর্জন করতে না পারাকে তিনি একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বিশ্বব্যাপী সংকটে বাংলাদেশেও নাভিশ্বাস উঠেছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, ‘সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সংকটের গোড়ায় পৌঁছেছেন। দশ কথার এক কথায় দেশের কাঠামোগত বড় ধরনের এক দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি দেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ন্যূনতম ১০ হাজার কোটি টনে উন্নীত হবে। এখন থেকেই এই বিষয়ে বাড়তি নজর না দিলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানটির সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও আধুনিক নতুন আরেকটি তেল পরিশোধনাগার স্থাপন করা সম্ভব হলে জ্বালানি খাতে ব্যয় কমে আসবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থায় পুরোপুরি বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারলে এই খাতে বাড়তি মুনাফা আয় করা সম্ভব হবে। চলমান সংকটের এই সময়ে ভবিষ্যৎকে রুদ্রকরোজ্জ্বল করতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুটি সামনে এনে সেনাপ্রধান অনলাইনে-অফলাইনে প্রশংসিত হয়েছেন। সেনাপ্রধানের আক্ষেপ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে এখানে বেশ কিছু কাজ করা সম্ভব হবে মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এর মাধ্যমে নিজের দেশেই সাশ্রয়ী মূল্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও বাড়বে। একটি অত্যাধুনিক নতুন প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠার পেছনে যে টাকা খরচ হবে সেটি পাঁচ বছরের মধ্যেই পরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় সাশ্রয় থেকে মেটানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে নিজের পথচলাকে মসৃণ করতে পারবে। পাশাপাশি দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়বে।
এছাড়াও ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে (এনডিসি) ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে বলেন, দেশের সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং আকাশপথের সুরক্ষায় শক্তিশালী বিমানবাহিনী অপরিহার্য। পর্যাপ্ত এয়ারক্রাফট ও নৌযান ক্রয়ে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ করার জন্য নয়, যুদ্ধ এড়ানোর সক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিই। আর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সেনাপ্রধান স্পষ্ট করে বলেন, যে অর্গানাইজেশনে জবাবদিহিতা নেই, সেটি উন্নতি করবে না। আমরা চাই সামরিক বাহিনী কী করছে, তা দেশের মানুষ আরও বেশি জানুক। সাধারণ মানুষের জানার ও প্রশ্ন করার অধিকার আছে। রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন জাতীয় সমস্যার কথা উল্লেখ করে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তরুণ প্রজন্মকে আরও সচেতন ও দক্ষ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান বিশ্বে যেকোনো ভুলের মূল্য অনেক বেশি। তাই নেতৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তায় বেসামরিক-সামরিক সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন তিনি। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের এসব বিষয়ে বক্তব্যকেও সময়োপযোগী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
আরএন