ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে এই প্রথম কোনো মুসলিম প্রতিনিধি ছাড়া সরকার গঠিত হয়েছে। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভায় ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী শপথ নেন। এর ফলে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ জনে।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন বিজেপি বিধানসভা নির্বাচনে একজন মুসলিম প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি।
দলের কিছু শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, সংখ্যালঘু ভোট তাদের প্রয়োজন নেই। যদিও সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিধায়ক না হয়েও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, যদি তিনি ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচিত হন।
সোমবারের এ ঘটনায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে সংখ্যালঘুবিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রীও হবেন একজন অ-সংখ্যালঘু। কারণ, ৪১ জন মন্ত্রীর সবাই হিন্দু। মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন বুধবার হওয়ার কথা।
সোমবার ১৩ জন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ২২ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। তাদের মধ্যে তিন জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী। তাঁরা ৯ মে শপথ নেওয়া শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরও পাঁচ জন মন্ত্রিসভার সদস্যের সঙ্গে যুক্ত হলেন।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। তাই রাজ্যের সরকারে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব প্রায় সব সময়ই ছিল। ব্যতিক্রম ছিল হাতে গোনা কয়েকটি সময়ের একটি, স্বাধীনতার পর গঠিত প্রথম সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ‘প্রিমিয়ার’ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ।
এরপর ১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকার থেকে শুরু করে গত ৫৪ বছরের প্রতিটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারেই মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম মুখ ছিল।
কলকাতাভিত্তিক এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘স্বাধীনতা ও দেশ ভাগের অব্যবহিত পরে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কারণে ১৯৫২ সালের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে কালীগঞ্জ থেকে এস এম ফজলুর রহমান জয়ী হওয়ার আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো মুসলিম সদস্য ছিল না। বিধান চন্দ্র রায় ও প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের মন্ত্রিসভায় তিনি প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং স্থানীয় স্বশাসন বিভাগের মতো দপ্তরের দায়িত্ব সামলেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ১৯৬০-এর দশকের অস্থির রাজনৈতিক সময়ে স্বল্পস্থায়ী সরকারগুলোর এক-দুটি ছোটখাটো ব্যতিক্রম ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের সব পূর্ণাঙ্গ সরকারেই মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ছিল। অন্তত ১৯৭২ সাল থেকে আর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।’
ওই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ১৯৫২-৬৭ সালের কংগ্রেস সরকারে সৈয়দ কাজিম আলি মির্জা ও মোহাম্মদ রফিক, ১৯৬৭-৭১ সালের জোট আমলে মোহাম্মদ আমিন এবং ১৯৭২-৭৭ সালের সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় সরকারের এবিএ গনি খান চৌধুরী, জয়নাল আবেদিন ও আবদুস সাত্তারের উদাহরণ দেন।
বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনামলে আবদুর রাজ্জাক মোল্লা, মোহাম্মদ আমিন, আনিসুর রহমান ও মোস্তফা বিন কাসেমের মতো মুসলিম মন্ত্রী ছিলেন। একই ভাবে বিধানসভার দুই স্পিকার সৈয়দ আবদুল মনসুর হাবিবুল্লাহ ও হাশিম আবদুল হালিমও ছিলেন মুসলিম।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনামলে ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ আহমেদ খান, মো. গোলাম রব্বানি ও সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীসহ আরও অনেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় নারী প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। ৪১ সদস্যের মন্ত্রিসভায় মাত্র ৭ জন নারী রয়েছেন, যা মোট সদস্যের প্রায় ১৭ শতাংশ। অগ্নিমিত্রা পল একমাত্র নারী মন্ত্রিসভার সদস্য।
তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন- কলিতা মাজি, পূর্ণিমা চক্রবর্তী, মালতী রাভা রায়, মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, সুমনা সরকার এবং গার্গী ঘোষ দাস।
মন্ত্রীদের তালিকায় স্থান না পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকাও কম বিস্ময়কর নয়। বিশিষ্ট অভিনেতা-রাজনীতিক রূপা গাঙ্গুলি ও রুদ্রনীল ঘোষকে স্পষ্ট ভাবেই উপেক্ষা করা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার চিকিৎসকের মায়েরও মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি, যদিও তিনি পানিহাটির বিধায়ক। তাঁর নির্বাচনী জয়কে অনেকেই ওই হাসপাতালের ঘটনাকে ঘিরে জনরোষের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিল্লির দলীয় নেতৃত্ব আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে অভিজ্ঞ দলীয় নেতাদেরই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বিজেপি কেন কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি, সে প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শুভময় মৈত্র বলেন, ‘মন্ত্রিসভা গঠন বিজেপির নির্বাচনী অবস্থানেরই প্রতিফলন। ভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক দলের ভেতরে চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসতে পারে। বিজেপির মধ্যেও উদারপন্থী শক্তি রয়েছে। তাই আগামী দিনে এই পরিস্থিতি বদলাতেও পারে।’
এমএ