নিস্তব্ধ রাত ভেঙে যখন কোনো শিশুর বুক ফাটা কান্না ভেসে আসে, তখন কেঁপে ওঠে মানবতার বিবেক। যে চোখে থাকার কথা ছিল স্বপ্নের আলো, সেখানে জমে ওঠে আতঙ্কের অন্ধকার। নিষ্পাপ শৈশবকে ছিন্নভিন্ন করে কিছু বিকৃত রুচির মানুষ বার বার নৃশংসতার দাগ আঁকে। অথচ অনেক সময় তারা আইনের ফাঁকফোকর গলে আবার সমাজে ফিরে আসে- এ যেন আমাদের নীরবতারই নির্মম পরাজয়।
এই অমানবিকতার অবসান চাই। এমন নেক্কারজনক অপরাধের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি- প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ড- নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এই রক্তচক্ষু দেখে আর কোনো বিকৃত মন দ্বিতীয়বার এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড তার উঁচু সেতু, বিস্তৃত মহাসড়ক বা প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বমূখী গ্রাফ নয়- তার শিশুদের নিরাপত্তা। যে দেশে শিশুরা ঘর, স্কুল কিংবা প্রতিবেশ- কোনো জায়গাতেই নিরাপদ নয়, সে রাষ্ট্রের উন্নয়ন চিত্র কাগজে যতই ঝকঝকে হোক, বাস্তবে তা নৈতিক ভাবে দূর্বল ও সামাজিক ভাবে ভঙ্গুর। আজ বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনা আমাদের নির্মম এক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে: আমরা শৈশবকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
প্রতিটি নতুন ঘটনার পর ক্ষণিকের ক্ষোভ, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়, মানববন্ধন এবং আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা- এসবের আড়ালে অপরাধীরা প্রায় নির্ভীক থেকে যায়। বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি, প্রভাবশালীদের চাপ এবং সামাজিক আপসের সংস্কৃতি শিশুদের জন্য ন্যায়বিচারকে আরও দূরবর্তী করে তোলে। ফলে শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান বাড়ে, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংখ্যা বাড়ে না।
শিশুদের কান্না আজ আর বিচ্ছিন্ন আর্তনাদ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীরবতা, সামাজিক উদাসীনতা এবং দূর্বল আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে এক জোরালো অভিযোগপত্র। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও যদি অপরাধীরা বার বার শাস্তিহীন থাকে, তবে সমস্যার মূল কারণ আইনের অভাব নয়, বরং আইনের প্রয়োগ, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি।
এতে দায় রয়েছে শুধু রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নয়- উকিলদের অসহযোগীতাও এই জটিলতার অংশ। অনেক সময় তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থের জন্য ধর্ষণকারীর পক্ষ নিয়ে তথ্য গোপন করে, মামলা দীর্ঘায়িত করে, অথবা জামিনের সুবিধা নিশ্চিত করে অপরাধীর প্রতি সুবিধা সৃষ্টি করে। এর ফলে শিশুদের প্রতি অন্যায়ের চক্র ক্রমেই প্রবল হচ্ছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ করা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছার সঙ্গে আইন প্রয়োগকে শক্তিশালী করা- এগুলো ছাড়া নির্যাতনের এই দুঃসহ চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল প্রায় ৬২৬টি, যা ২০২১ সালে বেড়ে প্রায় ৮১৮টিতে পৌঁছে- এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। পরবর্তী বছরগুলোতে নির্দিষ্ট ভাবে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব প্রকাশ না হলেও, ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৭৫৮ জন নারী ও মেয়ে শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৩০৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় ২০২৫ সালে; ওই বছরের প্রথম সাত মাসেই ৩০৬ জন শিশুকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। এসব পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়- এগুলো ভাঙা শৈশব, লাঞ্ছিত নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এক কঠিন প্রশ্ন।
তাই শৈশবকে রক্ষা করা কেবল মানবিক দায় নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের নৈতিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় আমরা আর কতবার ব্যর্থ হব? এখনই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে কাগজ থেকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময়।
বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ জাতিসংঘ শিশু সংস্থা UNICEF এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি Rana Flowers যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা কেবল উদ্বেগ প্রকাশ নয়- এটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
তিনি বলেছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এই ধারা একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয় এবং তাৎক্ষণিক সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
মাগুরার আট বছরের শিশুটির মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা কি কেবল শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকব, না কি এই শোককে রূপ দেব কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধে? তা না হলে এ রকম অসংখ্য শিশুর বীভৎস চিত্র আমাদের দেখতে হবে প্রতিনিয়ত।
মানবাধিকার সংস্থা Ain o Salish Kendra (ASK)-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে ৩০০-এর বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ১২ বছরের নিচে, এমনকি ৬ বছরের কম বয়সী শিশুও রয়েছে। একই সময়ে ছেলে শিশুরাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে- যা আমাদের আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এই সংখ্যাগুলো কেবল রিপোর্ট হওয়া ঘটনা; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
Bangladesh Mahila Parishad–এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ধর্ষণের মোট ঘটনার বড় অংশই কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত। অর্থাৎ নারী ও শিশু- দু’টি পরিচয়ের সংযোগস্থলে থাকা শিশুদের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
এই বাস্তবতা আমাদের দেখায় যে শিশুদের নিরাপত্তা শুধু আইন দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধী পরিচিত ব্যক্তি- আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা আস্থাভাজন কেউ। সামাজিক কলঙ্ক ও পারিবারিক চাপে অনেক পরিবার মামলা করতে সাহস পান না। দীর্ঘসূত্রিতা, প্রমাণ সংগ্রহে দূর্বলতা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে বহু মামলা শেষ পর্যন্ত ঝুলে থাকে।
বিশ্ব পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে জীবিত প্রতি আট নারী ও শিশুর মধ্যে একজন ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো না কোনো ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিরাপত্তার যে বলয় আমরা স্বাভাবিক ধরে নিই, সেই বলয়ের ভেতরেই হুমকি লুকিয়ে থাকে।
সরকার শিশু সুরক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছে। দ্রুত বিচার, ৯০ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (BTRC) উদ্যোগ- এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো- ঘোষণার সঙ্গে কার্যকর বাস্তবায়নের ফারাক কতটা?
শিশু সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রতিরোধমূলক কাঠামোর অভাব। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর গ্রেপ্তার ও বিচার প্রয়োজন, তবে তার আগে প্রয়োজন ঝুঁকি শনাক্তকরণ, প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা এবং শিশু কেন্দ্রিক নিরাপত্তা অবকাঠামো। পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় বিশেষায়িত শিশু সুরক্ষা ইউনিট গঠন এখন সময়ের দাবি। মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা না থাকলে তদন্তই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় ট্রমা।
বিচার ব্যবস্থার সংস্কারও অপরিহার্য। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হবে। সাক্ষ্যগ্রহণে শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত, ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং স্বাধীন ও জেন্ডার-সংবেদনশীল প্রসিকিউশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ধর্ষণকে আড়াল করে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার নয়- অপরাধকে তার প্রকৃত নামেই উল্লেখ করতে হবে।
সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। চটকদার শিরোনাম, ভুক্তভোগীর ছবি বা পরিচয় প্রকাশ শিশুদের মানসিক পুনর্বাসনে ক্ষতি করে। নৈতিক সাংবাদিকতা মানবিক দায়িত্বের অংশ। গণমাধ্যমকে মনে রাখতে হবে- একটি ভাইরাল সংবাদ কোনো শিশুর সারা জীবনের ক্ষতের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।
সমাজকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। পরিবারে যৌনতা ও শরীর সংক্রান্ত আলোচনা এখনো ট্যাবু। শিশুরা জানে না তাদের শরীরের সীমানা, ‘না’ বলার অধিকার বা বিপদের ক্ষেত্রে কার কাছে সাহায্য চাইবে। স্কুল কারিকুলামে বয়সোপযোগী সুরক্ষা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। স্থানীয় সরকার, মসজিদ-মন্দির-গির্জার ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতা বিস্তারে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
শিশু নির্যাতনের সঙ্গে দারিদ্র্য, শিশুবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য ও অনলাইন সহিংসতার সম্পর্ক গভীর। এগুলো আলাদা সমস্যা নয়; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক- আইন, শিক্ষা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা ও মনোসামাজিক সহায়তার সমন্বয়ে।
সবচেয়ে জরুরি হলো জবাবদিহিতা। তদন্তে গাফিলতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বা সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে। অপরাধী যেই হোক, তার সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী শিশু ও তার পরিবারকে রাষ্ট্রীয় ভাবে আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবা দিতে হবে।
শিশুরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ- এই কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে বর্তমানেই বিনিয়োগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়। শিশু সুরক্ষা কোনো দাতব্য কাজ নয়; এটি সংবিধান ও মানবাধিকারের মৌলিক দায়িত্ব।
আজ প্রয়োজন নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার মানসিকতা বন্ধ করা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলা। প্রতিটি শিশু যেন ঘর, স্কুল ও জনসমাগমস্থলে নিরাপদ থাকে- এটি কেবল নীতিগত অঙ্গীকার নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।
শিশু যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপসের কোনো সুযোগ নেই। দ্রুত বিচার, কার্যকর প্রতিরোধ এবং মানবিক পুনর্বাসনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ বাংলাদেশ।
এখন সিদ্ধান্ত আমাদের- আমরা কি কেবল শোক জানিয়ে শেষ করব, না কি সত্যিকারের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করব?
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেইলি অবজারভার।