রাজশাহী অঞ্চলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে ন্যায্য দাম না পেয়ে নাজেহাল অবস্থায় রয়েছে কৃষকেরা। গত বছর থেকে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত প্রধান ফসল ধানসহ আম, পেঁয়াজ, রসুন ও আলুর মতো কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে করে কৃষকের লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে। অনেক কৃষকের ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়েছে। অনেকের শেষ পুঁজিটাও হারিয়ে গেছে।
রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে বোরো ধান ও আমের ভরা মৌসুম চলছে। ঘরে নতুন ধান উঠছে, গাছে গাছে ঝুলছে আম। তবু কৃষকের মুখে হাসি নেই। কারণ এক বছরের মধ্যে বাজারে ধানের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে। এতে উৎপাদন খরচ ওঠানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।
এদিকে এবার আমের ভরা মৌসুমেও দাম না পেয়ে গাছে গাছে পেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আম। রাজশাহী অঞ্চলে আমের বড় বাজারে আমের ধস নেমেছে। ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় আমচাষীরা এবার বড় লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।
বড় লোকসান শুধু ধান ও আমেই নয়, গত এক বছর ধরে আলু, পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করেও উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, অনেক কৃষক মূল পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন।
কৃষকেরা বলছেন, দেশে নতুন সরকার এসে বড় বাজেট দিয়েছে, তাতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য পেলেই আমরা খুশি।
স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীরা বলছেন, জুন মাস ব্যাংক ক্লোজিং হওয়ায় চালকল মালিকেরা ধান কিনছে খুব ধীর গতিতে। এজন্য ধানের দাম নিম্নমুখী। তবে জুলাই মাসে কিছুটা ধানের দাম বাড়তে পারে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধান ব্যবসায়ীদের এমন দায়সারা কথা বলা উচিত নয়। সরকারকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে, না হলে দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদনের হার কমে যেতে পারে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার বাগমারাপাড়া গ্রামের কৃষক হযরত আলী চলতি বোরো মৌসুমে ২৫ বিঘা জমিতে বি-৭৬ জাতের ধান চাষ করেছেন। শুক্রবার তিনি ধান কেটে মাড়াই করেছেন।
কৃষক হযরত আলী বলেন, ২৫ বিঘার ধান মেশিন দিয়ে কেটে স্থানীয় একাধিক ধান ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রির জন্য গিয়েছিলেন। কেউ ধান কিনতে চায়নি। অবশেষে অন্য এক ব্যবসায়ী ৮০০ টাকা দরে প্রতি মণ কেনার জন্য রাজি হন। তিনি বলেন, এ বোরো ধান চাষে সেচসহ অনেক খরচ হয়েছে। ৮০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠবে না। এতে তার কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে।
বোরো ধান চাষ করে শুধু তানোরের কৃষক হযরত আলীই নন, বাজারে ধানের দাম না পেয়ে লোকসানে রয়েছেন হাজারো কৃষক। এতে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে কৃষকদের মাঝে।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মেলান্দী গ্রামের কৃষক অনিক কুমার চলতি বছর ৪০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বর্তমানে আলুর বাজার প্রতি কেজি ৮ টাকা। আর তার উৎপাদন খরচ ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে ১৯ টাকা। শেষ পর্যন্ত আলুর দাম না বাড়লে তার লোকসান হবে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
এই গল্প শুধু অনিক কুমারের একার নয়; আলু চাষ করে গত বছর থেকে শত শত কৃষক দাম না পেয়ে অনেকে লাখ লাখ টাকা লোকসান করেছেন। অনেক চাষি ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে দিয়েছেন। চলতি বছরেও এমন শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।
রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আমের জন্য বিখ্যাত। আমচাষীরা জানান, গত ১০ বছরের মধ্যে এবার আমের দাম এত কম হয়নি। এ বছর আম কেনার ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রতি কেজি আম ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে বাগান মালিকদের উৎপাদন খরচও উঠবে না, বরং বড় লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
এদিকে গত বছর থেকে পেঁয়াজ ও রসুন চাষীরাও ন্যায্য দাম না পেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন। বাজারে পেঁয়াজের দাম একেবারে নেই বললেই চলে। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। রসুনের দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি। কৃষকেরা বলছেন, বিশেষ করে রসুনের দাম যদি ২০০ টাকা কেজি হতো, তাহলে কৃষকেরা কিছুটা লাভবান হতেন।
তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের জাহাঙ্গীর নামে দুই রসুন চাষি বলেন, গত বছর দুই বিঘা রসুন চাষ করে পানির দামে বিক্রি করতে হয়েছে। চলতি বছরও দুই বিঘা চাষ করা হয়েছে। এবার বাজারে রসুনের দাম না থাকায় বাড়িতেই রেখে দিতে হচ্ছে। গত বছরের মতো দাম না পেলে আগামীতে আর রসুন চাষ করবেন না বলে জানান তারা।
রসুন চাষীরা বলেন, দেশে যে পরিমাণ রসুন চাষ হয়, তাতে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু দেশি রসুন থাকা সত্ত্বেও চায়না রসুন আমদানির কারণে দেশের কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, ধান, আম, পেঁয়াজ, রসুন, আলু—যে পরিমাণ উৎপাদন হয় তা দিয়ে দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণ করছেন কৃষকেরা। একের পর এক আবাদে লোকসানে পড়ছেন কৃষক। তারা তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরএইচ/আরএন