বাংলাদেশের আকাশে প্রতিদিনই নতুন সূর্য ওঠে। কিন্তু এই অপরিসীম শক্তির উৎসকে আমরা এখনো পুরোপুরি আপন করে নিতে পারিনি। একদিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির চাপ অর্থনীতিকে নানাভাবে সংকুচিত করছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি—সবকিছু মিলিয়ে আজ বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বিকল্প শক্তির সন্ধান আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। এই প্রেক্ষাপটে সৌর বিদ্যুৎ যেন এক অনিবার্য ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়—কিন্তু সেই দরজায় আমরা এখনো পুরোপুরি কড়া নাড়তে পারিনি।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌর শক্তির জন্য এক বিরল আশীর্বাদ। বছরের অধিকাংশ সময় জুড়েই সূর্যের আলো আমাদের দেশে অবাধে বিচরণ করে। গ্রামবাংলার খোলা মাঠ, শহরের ছাদ, নদীর বুক—সব জায়গাতেই সূর্যের আলো যেন নিঃশব্দে শক্তির সম্ভাবনা বয়ে নিয়ে আসে। বহু বছর আগে যখন বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, তখন সৌর হোম সিস্টেমই হয়ে উঠেছিল আলোর একমাত্র ভরসা। সেই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক উদ্যোগ নিলে সৌর শক্তি এই দেশের বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কেন সেই সম্ভাবনা আজও পূর্ণতা পায়নি?
সম্ভবত এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের নীতিগত দ্বিধা এবং বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতায়। আমরা একদিকে নবায়নযোগ্য শক্তির কথা বলি, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারি না। নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় এমন পথে হাঁটি, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। অথচ সূর্য, যে কিনা প্রতিদিন বিনামূল্যে শক্তি বিলিয়ে যাচ্ছে, তাকে কাজে লাগাতে আমাদের উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন এবং অপ্রতুল।
বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের অগ্রগতি যতটা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কিছু প্রকল্প হয়েছে, কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এটি এখনো জাতীয় জ্বালানি কৌশলের মূলধারায় জায়গা করে নিতে পারেনি। বড় আকারের সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে জমির অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে সামনে আসে। একটি ছোট ভূখণ্ডে বিপুল জনসংখ্যার চাপ—এই বাস্তবতায় হাজার হাজার একর জমি শুধু সৌর প্যানেলের জন্য বরাদ্দ করা সহজ নয়। ফলে পরিকল্পনা অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
আবার বিনিয়োগের প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সৌর প্রকল্পে প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলক বেশি, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি লাভজনক। কিন্তু আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এই খাতে বড় আকারে ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। নীতিগত সহায়তা থাকলেও তা অনেক সময় পর্যাপ্ত নয় বা বাস্তবায়নে জটিলতা থাকে। অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কখনো কখনো অস্বচ্ছতা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যায়।
তবে এর মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। দেশের শিল্প খাত ধীরে ধীরে সৌর বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের জন্য সবুজ শক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। শহরের ছাদগুলোও এখন সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি সঠিক নীতিমালা ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে এই ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎই একদিন জাতীয় উৎপাদনের বড় অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সৌর বিদ্যুৎকে আমরা যদি একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখি, তাহলে এটি কখনোই বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না। বরং এটিকে ভবিষ্যতের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে ভাবতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী নীতি, যেখানে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জমির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে নতুন চিন্তার দরকার। জলাশয়ের ওপর ভাসমান সৌর প্রকল্প, মহাসড়কের পাশে সৌর স্থাপন, এমনকি সরকারি ভবনের বাধ্যতামূলক সৌর ব্যবহারের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সঙ্গে গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং শক্তি সংরক্ষণের প্রযুক্তি উন্নয়ন করাও জরুরি, যাতে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ সর্বোচ্চ দক্ষতায় ব্যবহার করা যায়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সুশাসন। কোনো খাতই সুশাসন ছাড়া টেকসই হতে পারে না। সৌর বিদ্যুৎ খাতেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করতে পারে।
সৌর বিদ্যুৎ কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি মাধ্যম নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক মুক্তির পথ, একটি পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। এটি আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। চাইলে পুরনো পথেই হাঁটতে পারি, যেখানে সংকট, ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা আমাদের পিছু ছাড়বে না। আবার চাইলে আমরা নতুন পথ বেছে নিতে পারি—যেখানে সূর্যের আলোই হবে আমাদের শক্তির প্রধান উৎস। সেই পথ হয়তো সহজ নয়, কিন্তু সম্ভাবনায় ভরপুর। সুতরাং সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। আমরা কি সেই আলোর পথে হাঁটার সাহস দেখাবো, নাকি অন্ধকারের সঙ্গে আপস করেই চলবো?
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com