Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশ      প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      

তথ্যের জালে বিভ্রান্তি, যুক্তির অবক্ষয়: কুসংস্কারের ছায়ায় আমাদের ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ২:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ১৫৯)

তথ্যের এই অবারিত যুগে আমরা যেন সত্যের চেয়ে দ্রুত ছুটে চলেছি অর্ধসত্য আর গুজবের পিছু ধরে। স্মার্টফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি ভিডিও, প্রতিটি ‘ভাইরাল’ পোস্ট- কখন যে আমাদের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তা আমরা অনেক সময় টেরই পাই না। যুক্তির আলো যেখানে পথ দেখানোর কথা, সেখানে ক্রমেই জায়গা নিচ্ছে অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার এবং আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত। ফলে তথ্যের প্রাচুর্যই- এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে- আমাদেরকে করে তুলছে আরও বিভ্রান্ত, আরও অনিশ্চিত।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- শিক্ষিত ও প্রযুক্তি সচেতন নতুন প্রজন্মও গুজব ও কুসংস্কারের এই জালে আটকে পড়ছে। যাচাই-বাছাইয়ের অভ্যাস ক্রমেই হারিয়ে গিয়ে ‘শেয়ার’ ও ‘বিশ্বাস’-এর সহজ প্রবণতা আমাদের বোধ-বিবেচনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামান্য একটি ভুল তথ্য মুহূর্তেই ‘সত্য’ রূপে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, আর সেই তথাকথিত সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে জন্ম নিচ্ছে ভয়, ঘৃণা কিংবা অযৌক্তিক উন্মাদনা। প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি, না কি আধুনিকতার মোড়কে ফিরে যাচ্ছি এক অন্ধকার অতীতে?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ অত্যন্ত জরুরি। কারণ কুসংস্কারের ছায়া কেবল ব্যক্তির চিন্তাকেই নয়, সমগ্র সমাজের ভবিষ্যৎকেও গ্রাস করার ক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক দৃশ্যমান সোপানে দাঁড়িয়ে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ছুটে চলা যানবাহন, মেট্রোরেলের আধুনিক ছন্দ, কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে গ্রাম-শহরের দূরত্ব কমে আসা- সব মিলিয়ে আমরা প্রত্যক্ষ করছি এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে এক অদৃশ্য, অথচ গভীর সংকট- কুসংস্কার, গুজব এবং অন্ধ বিশ্বাসের বিস্তার। এই সংকট কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই এর প্রভাব বিস্তৃত। ফলে প্রশ্ন জাগে- আমরা কি কেবল বাহ্যিক উন্নয়নেই সন্তুষ্ট থাকব, না কি আমাদের চিন্তা-চেতনার ভেতরেও একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হব?

কুসংস্কার কোনো হঠাৎ জন্ম নেওয়া সামাজিক সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অজ্ঞতা এবং সামাজিকীকরণের জটিল ফল। বহু ক্ষেত্রে এটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে মানুষ যুক্তির পরিবর্তে প্রথাকে অনুসরণ করে। 

গ্রামবাংলার বাস্তবতায় এখনো দেখা যায়- কোনো রোগে আক্রান্ত হলে অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হয়ে ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ বা অলৌকিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। এই নির্ভরতা কেবল অজ্ঞতার প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বিশ্বাস ব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার চেয়ে প্রচলিত ধারণাই অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ফলে কুসংস্কার ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে সামাজিক সত্যে রূপান্তরিত হয়।

এই কুসংস্কারের সঙ্গে যখন গুজবের সংযোগ ঘটে, তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুজবের প্রকৃতি এমন যে, এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একসময় গুজব ছড়াতে সময় লাগত; কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে তা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু অসচেতন মহলের উসকানি- কখনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাইকিং, কখনো বিকৃত ব্যাখ্যা- যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এর পরিণতি আমরা দেখেছি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, হাট হাজারী- এমন অসংখ্য স্থানে।

অনেক ক্ষেত্রে ‘ছেলে ধরা’ বা ‘চোর’ সন্দেহে নিরপরাধ মানুষ নির্মম গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। এমন কি দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাতেও ঘটছে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা। একটি অযাচাইকৃত তথ্য, একটি বিকৃত ছবি, একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও কিংবা একটি উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য- এসবই হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতার উৎস। ফলে গুজব কেবল তথ্যগত বিভ্রান্তি নয়; এটি এক ভয়ঙ্কর সামাজিক বিপর্যয়।

গুজবের বিস্তারের পেছনে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষ সাধারণত সেই তথ্যই সহজে গ্রহণ করে, যা তার পূর্ব ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। পাশাপাশি ভয় ও অনিশ্চয়তা যুক্তিবোধকে দুর্বল করে দেয়, ফলে মানুষ দ্রুত কোনো ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে- তা যতই অযৌক্তিক হোক না কেন। যেমন- অনেক ধর্মীয় পেজ থেকে কোনো ঘটনার পোস্ট করা হলে কিম্বা কোনো রাজনৈতিক পেজ থেকে পোস্ট করা হলে বিচার বিশ্লেষণ না করে যখন একটি সমাজে যুক্তিনির্ভর চিন্তার চর্চা দুর্বল থাকে, তখন এই প্রবণতাগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

অন্ধ বিশ্বাস এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। এটি এমন এক মানসিকতা, যেখানে মানুষ কোনো কিছু যাচাই না করেই গ্রহণ করে। এই মানসিকতার শিকড় পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত। আমাদের সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে বড়দের কথা প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শেখে- প্রশ্ন করা নয়, বরং মেনে নেওয়াই শিষ্টাচার। এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করে, যারা যুক্তির চেয়ে আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর এবং বিজ্ঞানবিমুখ। এখানে তথ্য শেখানো হয়, কিন্তু সেই তথ্যের পেছনের যুক্তি বা প্রেক্ষাপট যথাযথ ভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না। ফলে শিক্ষিত হয়েও অনেকেই সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না এবং সহজেই গুজবের ফাঁদে পড়ে।

সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস টিকে থাকার পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত কারণ। দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যা তাকে সহজ ব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দেয়। পাশাপাশি ক্ষমতার কাঠামো অনেক সময় অন্ধ বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হয়, কারণ এটি মানুষকে প্রশ্নহীন করে তোলে। সাংস্কৃতিক অভ্যাস হিসেবে অনেক কুসংস্কার এতটাই গভীরে প্রোথিত যে সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই প্রবণতার অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পরিবর্তে কুসংস্কারে নির্ভরতা রোগ জটিল করে তোলে এবং ব্যয় বাড়ায়। গুজব-প্রসূত সহিংসতা সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানুষের চিন্তার ওপর- অবকাঠামোর ওপর নয়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যেসব দেশে যুক্তি ও বিজ্ঞানের চর্চা শক্তিশালী, সেসব দেশ উন্নয়নের দৌঁড়ে এগিয়ে। সেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা আছে, গণমাধ্যম দায়িত্বশীল এবং তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, যেখানে কুসংস্কার প্রবল, সেখানে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

তবে এই পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয় নয়। সঠিক নীতি, সচেতনতা এবং শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং পরিবারে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে প্রশ্ন করাকে উৎসাহিত করা হবে।

ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিভ্রান্তির সম্ভাবনাও। তাই ডিজিটাল লিটারেসি এখন সময়ের দাবি। মানুষকে জানতে হবে- কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোনটি নয়; কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়; এবং কীভাবে গুজব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হয়।

সবশেষে বলা যায়, কুসংস্কার, গুজব এবং অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি সামষ্টিক দায়িত্ব। এই লড়াইয়ে প্রয়োজন শিক্ষা, সচেতনতা, নৈতিকতা এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশ।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে তাকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ- যুক্তির আলো। সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্ব- আমার, আপনার, আমাদের সবার।

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেইলি অবজারভার।

এমএ




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close