পবিত্র ঈদুল আজহার পর কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। নগরী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহ, লবণজাতকরণ ও গুদামজাত করার কাজ চলছে পুরোদমে। তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেও চামড়া ব্যবসায়ীদের মুখে নেই স্বস্তি। বরং বাজারে চামড়ার দরপতন, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নের অভাবে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও কোরবানির মৌসুমে চামড়া ব্যবসা ছিল লাভজনক। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চামড়ার দাম কমতে থাকায় অনেকেই এই ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এবারও সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও সেই দামে চামড়া বিক্রির কোনো বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঈদের দিন এবং পরবর্তী সময়ে গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এর চেয়েও কম দামে চামড়া বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ চার থেকে পাঁচ বছর আগেও একই ধরনের একটি গরুর চামড়া এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৌসুমি চামড়া সংগ্রহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ছাগলের চামড়া ছিল ক্রেতাশূন্য।
ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের পর দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। এতে শ্রমিক খরচ, পরিবহন ব্যয়, লবণ ক্রয় এবং গুদামজাতকরণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫২ থেকে ৫৬ টাকা এবং খাসির চামড়ার দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই মূল্য নির্ধারণ বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, কারণ মাঠপর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর তদারকি নেই।
রাজশাহী মহানগরীর রেলগেট এলাকায় চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে কথা হয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তারা জানান, বাজারে বড় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ন্যায্য মূল্য আদায় করতে পারছেন না। অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী টিটু ইসলাম বলেন, “চামড়া কিনে সংরক্ষণ করতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। লবণের দাম, শ্রমিক খরচ, পরিবহন—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বিক্রির সময় সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন না হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”
আরেক ব্যবসায়ী আসাদুল আলী বলেন, “আগে ঈদের সময় চামড়া ব্যবসা করে ভালো লাভ হতো। এখন পরিস্থিতি পুরো উল্টো। অনেকেই লোকসানের ভয়ে চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।”
চামড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে জানিয়ে রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি লুৎফর রহমান বলেন, “এবার চামড়ার বাজার অনেক দুর্বল। চামড়ার গুণগত মান অনুযায়ী ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। এখনো অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীর কাছে চামড়া রয়েছে। মোকামে সব চামড়া আসতে আরও ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে। তখন চামড়ার দামের অবস্থা আরও স্পষ্ট হবে।” তিনি আরও বলেন, “চামড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।”
এদিকে ঈদের সময় সীমান্ত পথে চামড়া পাচারের আশঙ্কা থাকলেও এবার প্রশাসন শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “ঈদের আগেই চামড়া পাচার রোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে চামড়া পাচারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসন এবং বিজিবি এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছে।”
আরএইচ/আরএন