একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শিশু-কিশোরদের প্রাণের ঠিকানা। এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোনের পর্দা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অবসরের সময়টুকুও যখন ক্রমেই ভার্চুয়াল জগতে বন্দী হয়ে পড়ছে, তখন বইয়ের প্রতি নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন। ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব-২০২৬ ইতোমধ্যে উপজেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার এক নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে।
গত ২১ জুলাই শুরু হওয়া এই উৎসবে অংশ নিয়েছে শ্রীমঙ্গলের মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, জীবনী ও জ্ঞানভিত্তিক নানা বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তারা। বইকে আনন্দের সঙ্গী করে তোলাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
উৎসবটি তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে—মুকুল, ফুল ও ফল। প্রথম ধাপ ‘মুকুল’ পর্বে শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে মঙ্গলবার শ্রীমঙ্গলের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশ।
এ উপলক্ষে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান দিনব্যাপী সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ভৈরবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজনগর জে.এস.এস.আর. মাদ্রাসা, শ্রীমঙ্গল আনোয়ারুল উলুম ফাযিল মাদ্রাসা, সেন্ট মার্থাস হাই স্কুল এবং ভূনবীর দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। নিজের বই পড়ার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিয়মিত বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করতে শেখায় না; নিজেকে জানতে, সমাজকে বুঝতে এবং বিশ্বকে চিনতে শেখায়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বইয়ের আনন্দ ভাগ করে নিতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, বইপড়া একটি প্রজন্মই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসবের সমন্বয়ক ও শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসবের নির্বাহী পরিচালক দেবাশীষ দাশ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্লাবন পাল।
দিনব্যাপী আয়োজিত উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্ধারিত বইগুলো নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। বই হাতে নিয়ে অনেকেই জানান, পাঠ্যবইয়ের বাইরে এমন আয়োজন তাঁদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের কল্পনাশক্তি, ভাষাদক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে মুকুল পর্বে শ্রেণিভিত্তিক নির্ধারিত ১৪টি বই পড়ছে উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। আগামী ১৭ আগস্ট প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব বইয়ের ওপর শ্রেণিভিত্তিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা ১০ জন শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়ে অংশ নেবে দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল’ পর্বে। সেখানে নতুন বই পড়ে আবারও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষায় অংশ নেবে তারা। এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা তিনজন শিক্ষার্থী উপজেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
চূড়ান্ত ধাপেও থাকবে নতুন বই ও নতুন মূল্যায়ন। এই ধাপ শেষে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি শ্রেণির সেরা ১০ জন নির্বাচিত হবে। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে অন্তত তিনটি পৃথক বই পড়ে তিন ধাপের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যাবে।
এবারের উৎসবে যুক্ত হয়েছে উন্মুক্ত বিভাগ। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের যে কোনো বয়সী বইপ্রেমী নিবন্ধন করে এই উৎসবে অংশ নিতে পারবেন। ফলে বইপড়ার এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।
উপজেলা প্রশাসন, শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে সমন্বয়-সহযোগী হিসেবে রয়েছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব এবং পাঠ-সহযোগী হিসেবে রয়েছে উত্তরণ।
প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে শিশু-কিশোরদের হাতে বই তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগকে ইতোমধ্যেই সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিসেবীরা। তাঁদের মতে, বই শুধু তথ্য দেয় না; বই মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে।
শ্রীমঙ্গলে শুরু হওয়া এই বইপড়া উৎসব তাই কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা। যে আন্দোলনের লক্ষ্য—একটি বইমুখী, চিন্তাশীল ও আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলা।
এসএস/আরএন