ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
মাদকের করালগ্রাসে পরিবার ও ভবিষ্যৎ
✎ রায়হানুল ইসলাম
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:৪৪ পিএম
X

বাংলাদেশ আজ যে নানামুখী সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তার মধ্যে মাদক সমস্যা অন্যতম ভয়াবহ। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; বরং পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সংকট। মাদকদ্রব্যের বিস্তার ধীরে ধীরে এমন এক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই “মাদকের করালগ্রাসে পরিবার ও ভবিষ্যৎ”—এটি আজ অতিরঞ্জন নয়, বরং এক কঠিন সত্য।

মাদকাসক্তি সাধারণত ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা হলেও এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক অশান্তি, বন্ধুবান্ধবের প্রভাব এবং সহজলভ্যতা—এসব কারণ তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে কিশোর ও যুবসমাজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তারা দেশের সম্ভাবনাময় শক্তি; অথচ মাদকের ফাঁদে পড়ে অনেকেই হারিয়ে ফেলছে জীবনের লক্ষ্য ও স্বপ্ন।

পরিবারই একজন মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। কিন্তু পরিবারের ভেতর যখন অশান্তি, অনাস্থা বা যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়, তখন তরুণরা বাইরে বিকল্প আশ্রয় খোঁজে। অনেক সময় সেই আশ্রয় হয়ে ওঠে মাদকাসক্ত বন্ধুমহল। একজন সদস্য মাদকাসক্ত হলে তার প্রভাব পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে তোলে। অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে, সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবুও মাদক চোরাচালান ও বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এটি কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি—সবখানেই মাদকের ছায়া বিস্তার করছে।

মাদক সমস্যার একটি বড় দিক হলো পুনর্বাসনের অভাব। অনেক আসক্ত চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হলেও পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্রের ঘাটতি রয়েছে। সমাজে মাদকাসক্তদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা আবারও একই চক্রে ফিরে যায়। এ অবস্থায় কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, মানবিক ও চিকিৎসাভিত্তিক উদ্যোগও জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সহশিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তরুণদের বিকল্প পথ দেখাতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ, সময় দেওয়া এবং তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন। প্রতিরোধ শুরু হতে পারে ঘর থেকেই।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে ইতিবাচক প্রচার, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগও অপরিহার্য। সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকবিরোধী মনোভাব গড়ে না উঠলে কেবল আইন দিয়ে এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।

মাদক কেবল ব্যক্তির শরীর ও মনকে ধ্বংস করে না; এটি একটি জাতির সম্ভাবনাকেও গ্রাস করে। যে তরুণ আজ মাদকাসক্ত, সে আগামী দিনের দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা বা নেতা হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। ফলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ তার তরুণ প্রজন্মের ওপর নির্ভরশীল; সেই প্রজন্ম যদি মাদকের করালগ্রাসে পড়ে, তবে উন্নয়নের স্বপ্নও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, সচেতনতা বৃদ্ধি, পুনর্বাসন কেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি—এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক বন্ধন যত দৃঢ় হবে, মাদক তত দুর্বল হবে।

সবশেষে বলা যায়, মাদকবিরোধী লড়াই কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত সংগ্রাম। পরিবারকে হতে হবে সজাগ ও সহমর্মী, সমাজকে সচেতন ও প্রতিরোধী, আর রাষ্ট্রকে দৃঢ় ও মানবিক। তাহলেই সম্ভব মাদকের করালগ্রাস থেকে পরিবার ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।

একটি সুস্থ, সচেতন ও উৎপাদনশীল জাতি গড়তে হলে এখনই সময় মাদকের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ আজ যে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, যে তরুণ পথ হারাচ্ছে—সেই ক্ষত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বহন করবে। মাদকের অন্ধকার ছায়া দূর করে আলোর পথে ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝