বেনাপোল স্থলবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ইলিশ মাছ জব্দের ঘটনা কেবল একটি চালান আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শুল্ক ফাঁকি ও ঘোষণার বাইরে পণ্য আমদানির একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বন্দর ও তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ৩১ নম্বর কাঁচামাল শেডে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি আটক করা হয়। ভারত থেকে আমদানি করা দুটি ট্রাক (WB25K-3029 ও WB11E-5027) থেকে পণ্য খালাসের সময় সন্দেহ দেখা দিলে কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়।
কাস্টমস সূত্র জানায়, ঘোষণাপত্রে ‘সুইট ফিস’ হিসেবে বোয়াল, ফলিও ও বাঘাইর মাছ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে ২২৫ প্যাকেজের মধ্যে ৫৪ প্যাকেজে প্রায় সাড়ে তিন টন ভারতীয় ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। জব্দকৃত ইলিশের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের এই স্পষ্ট অমিলের কারণে পুরো চালানটি তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করা হয়। তবে পচনশীল পণ্য বিবেচনায় ইলিশ ছাড়া অন্যান্য মাছ শর্তসাপেক্ষে ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।
কাস্টমস নথি অনুযায়ী, চালানটির ভারতীয় রপ্তানিকারক ছিল মেসার্স আরজে ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশি আমদানিকারক হিসেবে দেখানো হয় সাতক্ষীরার মেসার্স জান্নাত এন্টারপ্রাইজকে এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের দায়িত্বে ছিল বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠান লিংক ইন্টারন্যাশনাল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, এই তিন পক্ষের সমন্বয়েই ঘোষণাপত্রে পণ্যের প্রকৃতি গোপন রেখে উচ্চমূল্যের ও নিয়ন্ত্রিত পণ্য কম শুল্কে খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
এ ঘটনায় পরীক্ষণ সুপার উদ্ধব চন্দ্র পালের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ব্যবসায়ী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, তিনি পদের অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে আসছেন।
ঢাকার আমদানিকারক ব্যবসায়ী মো. সুরত আলী বলেন, “উদ্ধব চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে, এমনকি সম্প্রতি গণমাধ্যমেও সেগুলো প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে মাঠপর্যায়ে বার্তা যায়—অভিযোগ করলেও কিছু হয় না। ফলে মিথ্যা ঘোষণার মতো অনিয়ম বারবার ঘটছে।”
তিনি আরও বলেন, একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠা মানেই ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। শুরুতেই জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের বড় চালান জব্দের ঘটনা এড়ানো যেত।
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের প্রকৃত অবস্থার স্পষ্ট অমিল পাওয়া গেছে, যা শুল্ক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তদন্তের আওতায় রয়েছে। কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই অনিয়মে জড়িত থাকলে তদন্তে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধেও আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
এসকেআর/এসআর