ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে নতুন করে উদ্বেগ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকার অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করে তাদের বহিষ্কারের লক্ষ্যে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে সীমান্ত এলাকায় বহু বাংলাদেশি নাগরিককে জড়ো করা হচ্ছে এবং তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত ও বসতির ইতিহাস রয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পর অবৈধ অভিবাসন রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। রাজ্যজুড়ে আটক কেন্দ্র বা ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করে সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের আটক রাখা হচ্ছে।
এই অভিযানে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বহু মুসলিমও উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, অভিযানটি কেবল আইনি অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, ধর্মীয় পরিচয়কেও বিবেচনায় নিচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালে আসামে বেশ কয়েকজন ভারতীয় মুসলিমকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্তে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। পরে বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ না করায় তারা সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েন। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
সাতক্ষীরার বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম জানান, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য দুই বছর আগে ভারতে গিয়েছিলেন। পরে তুলনামূলক বেশি আয়ের কারণে সেখানে থেকে যান। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে তিনি ও তার পরিবার আত্মসমর্পণ করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মিরাজুল গাজী নামের আরেক বাংলাদেশি শ্রমিক। তিনি বলেন, পাঁচ বছর ধরে ভারতে কাজ করলেও নতুন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের বিরূপ আচরণ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। আরও শতাধিক ব্যক্তি আটক রয়েছেন এবং তাদের নাগরিকত্ব যাচাই শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ভারতের কাছে একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু থেকে বিএসএফ একাধিকবার লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ইলাইন পিয়ারসন বলেছেন, বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভুলবশত কোনো ভারতীয় নাগরিক বহিষ্কৃত না হন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশি মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মানবাধিকারকর্মী তিস্তা সেতালভাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পূর্বধারণার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা অনেক অভিবাসী এখন নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের অনেকের দাবি, উন্নত জীবিকার আশায় ভারতে গিয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য কঠিন ও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল জাজিরা
এসআর