ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
নদী যখন স্বপ্নচুরির দেয়াল, “আশার তরী” তখন এক অদম্য বিদ্রোহ
✎ অবজারভার প্রতিনিধি
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪১ পিএম
X
Advertisement

ভোরবেলার কুয়াশাভেজা খোলপেটুয়া নদের পাড়ে দাঁড়ালে এক সময় কেবল দীর্ঘশ্বাস শোনা যেত। ১৪ বছরের সুমি (ছদ্মনাম) কিংবা তার সহপাঠীদের কাছে নদী মানেই ছিল এক অনিশ্চিত বাধা। ওপারে স্কুল খোলা, কিন্তু এপারের গাবুরা ঘাটে কোনো নৌকা নেই। মাঝিদের সেই চিরাচরিত কথা- “সিরিয়াল ছাড়া নৌকা ছাড়বে না।” সেই সিরিয়ালের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কত শিক্ষার্থীর পরীক্ষার খাতা সাদা থেকে গেছে, কত মুমূর্ষু রোগী ঘাটের কাদা-মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই।

কিন্তু গাবুরার এই নোনা জল আর বঞ্চনার গল্পটা বদলে দিতে চাইল একদল কিশোর-কিশোরী। আজ শনিবার সকাল ১১ ঘটিকায় শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিস ঘাট সংলগ্ন এলাকায় শুভ উদ্বোধন হলো সেই স্বপ্নের “আশার তরী”।

জলবায়ু বিপন্নতার নির্মম বাস্তবতা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় শ্যামনগর কেবল একটি মানচিত্রের অংশ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এক জীবন্ত ক্ষত। ক্রমাগত নদীভাঙন আর লোনা পানির আগ্রাসনে এখানকার মানুষের জীবন লণ্ডভণ্ড। বিশেষ করে গাবুরা ইউনিয়নের মানুষের জন্য মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ নদী। এই নদীপথই হয়ে দাঁড়িয়েছিল অভিশাপ; যেখানে নিয়মিত নৌযান না থাকায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারত না এবং গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা নিতে গিয়ে জীবন সংকটাপন্ন হতো।

ফুটবলের মাঠ থেকে অধিকারের লড়াই
এই বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ দেখাল ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও তেরে দেস হোমস-এর সহায়তায় গঠিত শিশু ও যুব গ্রুপ কেবল ফুটবল নিয়ে মাঠে দৌড়ায়নি; তারা ‘ফুটবল ফর প্রটেকশন’ সেশনের মাধ্যমে শিখেছে আত্মবিশ্বাস আর সৃজনশীল চিন্তা। তারা বুঝতে পারে, তাদের পড়াশোনা আর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথে সবচেয়ে বড় বাধা-ঘাটের অব্যবস্থাপনা। কারো দয়ার অপেক্ষা না করে গাবুরার B2 ও B5 শিশু ও যুব দলের সদস্যরা স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় তৈরি করল এক অভূতপূর্ব সমাধান- এই “আশার তরী”।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও অতিথিবৃন্দের বক্তব্য
আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলার লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিভিল জজ মিলন দাস। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো: রোকনুজ্জামান, জেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার আ.ন.ম. নাজমুল উলা, বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক, ৯নং বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম, এবং ১২ নং গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জি এম এম মাসুদুল আলম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও তেরে দেস হোমস-এর প্রতিনিধিবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মিলন দাস আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "আজকের এই নৌকা কেবল কাঠ আর ইঞ্জিনের কোনো নৌযান নয়, এটি উপকূলের শিশুদের আইনি ও সামাজিক অধিকার আদায়ের এক প্রতীক। তারা প্রমাণ করেছে, সমস্যা সমাধানের জন্য বড় কারো অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজেদের শক্তি দিয়েই পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটি সারা দেশের জন্য একটি মডেল হতে পারে।"

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, "আমার ইউনিয়নের মানুষের যে কষ্ট আমি প্রতিদিন দেখতাম, এই শিশু-কিশোররা আজ তার সমাধান বের করে দিল। তারা আর জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার নয়, তারা এখন পরিবর্তনের কারিগর।"

অনুষ্ঠানে ৯নং বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম তার বক্তব্যে এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, "বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরার মানুষের জন্য নদী পারাপার ছিল এক বিভীষিকার নাম। বিশেষ করে আমাদের এই ফরেস্ট অফিস ঘাটে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের যে ভোগান্তি পোহাতে হতো, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ আমাদের শিশু-কিশোররা যে 'আশার তরী' ভাসিয়েছে, তা কেবল একটি নৌকা নয়, এটি আমাদের ঐক্যের প্রতীক। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এই মহৎ উদ্যোগকে টেকসই করতে আমরা সব ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখব। আমি গর্বিত যে আমার এলাকার সন্তানরা আজ সমস্যার সমাধান দিচ্ছে।"

কেন ‘আশার তরী’ অনন্য?
শিক্ষার অধিকার: স্কুল-কলেজ গামী শিক্ষার্থীদের জন্য এই নৌকার কোনো সিরিয়াল নেই, নেই কোনো ভাড়া। এটি নিশ্চিত করছে যে, দারিদ্র্য যেন শিক্ষার পথে বাধা না হয়।

মানবিক অগ্রাধিকার: মুমূর্ষু রোগী, প্রতিবন্ধী এবং গর্ভবতী নারীরা পাবেন সবার আগে পার হওয়ার সুযোগ। সংকটের মুহূর্তে এই নৌকাই হয়ে উঠবে একটি ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স।

অর্থনৈতিক প্রভাব: যাতায়াত ব্যয় কমে যাওয়ায় উপকূলের দরিদ্র পরিবারগুলোর বছরে প্রায় ২৪,০০০ টাকা থেকে ৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে।

জীবনরক্ষা: দ্রুত নদী পারাপারের মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত ৫০০ থেকে ১০০০ জন জরুরি রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

আগামীর ভিশন
উদ্বোধনীর দিনে যখন “আশার তরী” প্রথম খোলপেটুয়া নদের বুক চিরে এগোচ্ছিল, তখন অভিভাবকদের চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল। সেই জল হার মানার নয়, বরং প্রাপ্তির। যুব প্রতিনিধিরা আজ দৃপ্তকণ্ঠে বলছে, “এই নৌকা আমরা ভাসিয়েছি, এর হালও আমরাই ধরব।”  খোলপেটুয়া নদের লোনা বাতাস আজ আর দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে না, বরং বয়ে আনে সেই অদম্য তারুণ্যের জয়গান। “আশার তরী” কেবল একটি ঘাট পারাপার করছে না, এটি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, বঞ্চনা থেকে অধিকারের দিকে একটি জনপদকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এটিই আগামীর অপরাজেয় শ্যামনগর।

এসআর

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement