কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মাঠে উপস্থিতি জানান দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৩ জুন) দলটির পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারে ঝটিকা মিছিল বের করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা-উপজেলা কমিটিগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম গোছানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতির মধ্য দিয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের জামিন দেওয়ার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোভাব যাচাই করা হবে। সেই সঙ্গে প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক ফোরামের সমর্থন-সহায়তা আদায়ের কার্যক্রমও চূড়ান্ত করা হবে।
ভারতে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক জানিয়েছেন, দিনটি উপলক্ষে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৭৮টি জেলায় যে কোনোভাবে মিছিল আয়োজনের জন্য প্রতিটি সাংগঠনিক কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে এবং সামাজিক মাধ্যমে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। একই সঙ্গে আজ অথবা বুধবারের মধ্যে জাতীয় ও দলীয় পতাকা নিয়ে ঝটিকা মিছিল করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া আগামী ১ জুলাই সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। সোমবার রাতে ভারতের কলকাতায় আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা (মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মাহবুবউল-আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম) এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে কর্মীদের এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
তবে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের দিনক্ষণ নিয়ে দলটিতে অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তার প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হলেও, বর্তমানে শেখ হাসিনা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে জানা গেছে। গত ১২ জুন দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের নেতৃত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
গত কয়েক দিনে আওয়ামী লীগের মাঝারি পর্যায়ের অন্তত ৫২ জন নেতা ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন। সংসদ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় এবং সম্প্রতি সাবেক এমপি তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস ও জেবুন্নেছা আফরোজসহ কিছু নেতা জামিন পাওয়ায় অন্যরাও আশাবাদী হয়ে উঠছেন। দেশে ফিরে আসা নেতারা সুবিধামতো সময়ে আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিনের আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে কমপক্ষে ২৫ জন শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-এমপি-মেয়রের হদিস না মেলায় এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখায় মাঠ পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিলেও পরেই তিনি গ্রেপ্তার হন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ২২ মাসে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ হাজার ৮৬৮টি মামলা করা হয়েছে, যেখানে আসামির সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারাদেশে মোট ৬৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা, এবং বাকিগুলো রাষ্ট্রদ্রোহ, দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা।
আসামির তালিকায় ২৩ জন সাবেক মন্ত্রী, ১১ জন প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী, ৬৬ জন সংসদ সদস্য এবং ৮ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি রয়েছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগের বিপরীতে ৩৯৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৮০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হতাহতের ঘটনায় দায়েরকৃত ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে আইনি জটিলতায় মাত্র ২৪২টি মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে, বাকিগুলোর কার্যক্রম ঝুলে আছে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি ও দায়িত্বশীল নেতাসহ তিন শতাধিক ব্যক্তি কারাগারে আছেন। শীর্ষ কারাবন্দিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আমির হোসেন আমু ও রমেশ চন্দ্র সেন। (উল্লেখ্য, তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন)। এছাড়া রয়েছেন কাজী জাফর উল্যাহ, ড. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও আহমদ হোসেন। অন্যান্য হেভিওয়েট নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, টিপু মুনশি, সাধন চন্দ্র মজুমদার, আসাদুজ্জামান নুর, নুরুল ইসলাম সুজন, মাহবুব আলী, ড. তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী, কামাল আহমেদ মজুমদার, আতিকুল ইসলাম, জুনাইদ আহমেদ পলক, হাজী মোহাম্মদ সেলিম, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, শামসুল হক টুকু, ফরহাদ হোসেন, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, জান্নাত আরা হেনরী, এনামুল হক, আবুল কালাম আজাদ, বলরাম পোদ্দার, মমতাজ বেগম, সাবিনা আক্তার তুহিন এবং ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকত।