রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ‘দৈনিক সকালের বার্তা’র রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশিরের ওপর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের বর্বরোচিত হামলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই নয়, বরং তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম পরিস্থিতির এক গভীর ও উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত কর্মসূচির পর খোদ গণমাধ্যম কর্মীদের ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কলার ধরা, ঘুষি মারা এবং রাস্তায় ফেলে লাথি মারার এই ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে সচেতন মহলকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতে, ধানমন্ডির এই ঘটনা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা দেয়।
‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’র দ্বিমুখী নীতি
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর থেকে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে জোর সওয়াল করে আসছে। জামায়াতে ইসলামীও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের এই সহিংসতা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, দলগুলোর মুখে বলা ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’র বুলি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বাস্তব আচরণের মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব রয়ে গেছে। একজন সাংবাদিকের স্বাধীন মত প্রকাশ বা পেশাগত অবস্থান যদি কোনো দলের মনঃপূত না হয়, তবে তার ওপর চড়াও হওয়া পুরোনো ফ্যাসিবাদেরই ভিন্ন রূপ মাত্র।
ভিন্নমত দমনের নতুন এক ‘সংস্কৃতি’
আহত সাংবাদিক শিশির নিজে প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সাংবাদিকের কলার ধরা আর তাকে মারধর করা কি আপনাদের স্বাধীনতার নমুনা? এই প্রশ্নটি মূলত বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তার এক বড় সংকটকে সামনে আনে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে বা যারাই মাঠে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, তারা নিজেদের সমালোচক বা স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ ট্যাগ দিয়ে দমন করার এক নতুন হাতিয়ার পেয়ে গেছে। এই ‘ট্যাগিং সংস্কৃতি’ যে কোনো ভিন্নমত বা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে স্তব্ধ করার এক বিপজ্জনক বার্তা।
মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণহীনতা
ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যতই সংযত ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বলুক না কেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উগ্রতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছেন। রাজনৈতিক মাঠ নিজেদের দখলে নেওয়ার অতি-উৎসাহ অনেক সময়ই নেতৃত্বকে ছাপিয়ে ক্যাডারভিত্তিক রূপ নিচ্ছে।
ভয়ের পরিবেশ ও সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকি
যখন একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য ব্রিফিংয়ের স্থান থেকে সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা হয়, তখন তা সাধারণ সংবাদকর্মীদের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি করে। মাঠপর্যায়ের রিপোর্টাররা যদি যেকোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে গিয়ে নিজেদের নিরাপদ বোধ না করেন, তবে বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতা মুখ থুবড়ে পড়বে। ধানমন্ডির এই ঘটনা বার্তা দেয় যে, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকি ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার বাস্তবতায় কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি।
জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই এই ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ মনে করে এবং সাংবাদিকদের প্রতি কোনো ধরনের অসদাচরণ সমর্থন না করে, তবে শুধু বিবৃতির মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে অনতিবিলম্বে ভিডিও ফুটেজ দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে, মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর এই ধরণের আঘাত দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রাকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ ও কলঙ্কিত করবে।
সাংবাদিকে মারধরের ঘটনায় যা জানা গেল
দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির বলেন, 'ধানমন্ডিতে মিছিল শেষ করে জামায়াতের নেতারা তখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। হাজারীবাগ থানার আমির যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তখন টিভির ক্যামেরাম্যানেরা তাদের বলছিলেন- সবাই বক্তব্য না দিয়ে মূল বক্তা যেন বক্তব্য দেন। সবাই বক্তব্য দিলে আমরা সেটি নিউজে ধরাতে পারব না। তখন হাজারীবাগ থানার আমির বলেন, আমরা সবাই বক্তব্য দিব, আপনারা থাকলে থাকেন, না থাকলে নাই। আপনাদের দরকার নাই।'
তিনি বলেন, 'আমি তখন প্রতিবাদ করে বলি, আপনারা এভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। আমরা তো সাংবাদিক, আপনাদের কর্মী নই। এরপর কয়েকজন এসে আমার আইডি কার্ড চেক করে। আমি আইডি কার্ড পকেট থেকে বের করার আগেই স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে মারধর শুরু করে। এরপর আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে দ্বিতীয় দফায় আমার ওপর হামলা করা হয়। পরে উপস্থিত সাংবাদিকরা আমাকে উদ্ধার করে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আমি বাসায় আসি। বিকেলে আবার হাসপাতালে যেতে হবে কিছু টেস্ট করানোর জন্য। মেডিসিনও কিনতে হবে।'
এই ঘটনার পর জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন ও সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন তাঁর খোজ নিয়েছেন এবং এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে জানান শিশির।
এদিকে, এ ঘটনা তদন্তে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ও ধানমন্ডি জোনের পরিচালক নুর নবী মানিকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবারের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জামায়াত।
সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার নিন্দার ঝড় উঠেছে ফেসবুকে। এই ঘটনায় সাদা পাঞ্জাবি পড়া সেই লোকসহ দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ও দাবী জানান সাংবাদিকরা।
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka. E-mail: online@dailyobserverbd.com mailobserverbd@gmail.com