Tuesday | 16 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Tuesday | 16 June 2026 | Epaper
BREAKING: স্পেনকে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দের স্মরণীয় ড্র      তোষামোদ নয়, গণমাধ্যমকে সত্য তুলে ধরতে বললেন প্রধানমন্ত্রী      স্পেনের একাদশে চমক, নেই ইয়ামাল      আলজেরিয়ার বিপক্ষে নামলেই নতুন রেকর্ড মেসির      দিল্লিতে উপদেষ্টার সঙ্গে হওয়া ঘটনায় ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা      ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়      আদ্ দ্বীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      

পথে পথে চাঁদা, দামে আগুন: অদৃশ্য করের বোঝায় পুড়ছে বাজার

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬, ৫:০৬ পিএম   (ভিজিট : ১২১)

ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকের দিন শুরু হয়। শিশিরভেজা পাতার ফাঁকে ফাঁকে তিনি শসা, বেগুন, লাউ কিংবা টমেটো তুলে নেন অতি যত্নে। তার মনে তখন একটাই আশা—আজকের ফসলটি ভালো দামে বিক্রি হবে। কিন্তু সেই ফসল যখন গ্রামের হাট ছাড়িয়ে জেলা শহর পেরিয়ে রাজধানীর পথে যাত্রা শুরু করে, তখন তার ওপর আর কেবল প্রকৃতির হিসাব চলে না; যোগ হয় মানুষের তৈরি এক জটিল অদৃশ্য অর্থনীতি। সেই অর্থনীতির নাম—পথে পথে চাঁদা।

ধরা যাক, বগুড়া-র কোনো আড়তে শসা ৩৭ টাকা কেজি, বেগুন ৩৫ টাকা। কৃষক হয়তো আরও বেশি দাম প্রত্যাশা করেছিলেন, কিন্তু নগদের প্রয়োজন, বাজারের চাপ এবং সংরক্ষণ-সুবিধার অভাবে তিনি আপস করেন আড়তদারদের সাথে। আড়তদার তার কমিশন নেন, পরিবহনকারী গাড়িতে তোলেন পণ্য। এ পর্যন্ত হিসাবটি স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন পণ্যবাহী ট্রাকটি সড়কে ওঠে। বাজারে ঢুকতে একটি ফি, বের হতে আরেকটি; লোড-আনলোডে আলাদা দাবি; শ্রমিক সংগঠনের নামে অতিরিক্ত টাকা; সড়কে থামালে ‘চেকিং খরচ’; শহরে ঢোকার আগে ‘লাইন ঠিক করার’ নামে অনানুষ্ঠানিক আদায়—সব মিলিয়ে একেকটি ট্রাক যেন অদৃশ্য টোলগেটের সারি পেরিয়ে এগোয়।

এই অর্থপ্রবাহের বেশিরভাগই অস্বচ্ছ। কোনো রসিদ নেই, কোনো নির্দিষ্ট হার নেই, নেই জবাবদিহিতাও। পরিবহনকারীরা জানেন, আপত্তি করলে গাড়ি আটকে রাখা হতে পারে, ভাংচুর করা হতে পারে, পণ্য নামাতে দেরি হতে পারে, কিংবা নানা অজুহাতে হয়রানি শুরু হতে পারে। ফলে তারা হিসাব করে নেন—যা দিতে হয়, দিতেই হবে। আর সেই খরচ যোগ হয় পণ্যমূল্যে।

এভাবে ৩৭ টাকার শসা রাজধানীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৮০ কিংবা ৯০ টাকায় দাঁড়ায়। শহরের ভোক্তা তখন ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তোলেন—দাম এত বাড়ল কেন? কেউ বলেন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কেউ বলেন মৌসুমি সংকট, কেউ বা দোষ দেন খুচরা বিক্রেতাকে। কিন্তু এই সরল ব্যাখ্যার আড়ালে রয়ে যায় সরবরাহ শৃঙ্খলের অদৃশ্য স্তরগুলো, যেখানে বৈধ খরচের সঙ্গে মিশে থাকে অবৈধ আদায়।

অর্থনীতির ভাষায় এটিকে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক কর বলা যেতে পারে। রাষ্ট্র যে কর আদায় করে, তার বিনিময়ে নাগরিক সেবা প্রত্যাশা করে। কিন্তু পথে পথে যে অর্থ আদায় হয়, তার বিনিময়ে কোনো সেবা নেই; বরং আছে অনিশ্চয়তা ও ভীতি। এই অদৃশ্য কর বাজারকে অস্থির করে, মূল্যকে অনির্দেশ্য করে এবং শেষ পর্যন্ত কৃষক ও ভোক্তা—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

কৃষক ন্যায্য দাম পান না, কারণ তার সামনে সরাসরি শহুরে বাজারে পৌঁছানোর অবকাঠামো নেই। তিনি মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে শহুরে ভোক্তা চড়া দামে কিনতে বাধ্য হন, কারণ সরবরাহের প্রতিটি স্তরে খরচ বেড়েছে। দুই প্রান্তের এই বৈপরীত্যই চাঁদা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে। যারা মাঝপথে আছে, তারা জানে—ব্যবস্থাটি অস্বচ্ছ; কিন্তু এটি ভাঙার মতো প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নেই।

প্রশাসনিক দুর্বলতা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক বাজার ইজারা পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ইজারাদার নির্ধারিত হারে ফি আদায় করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠলেও দ্রুত প্রতিকার মেলে না। কখনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য—সব মিলিয়ে একটি নীরব সমঝোতা গড়ে ওঠে। বৈধ ও অবৈধের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।

এ অবস্থায় খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সমস্যার শিকড় অক্ষত থাকে। কারণ খুচরা বিক্রেতা অনেক সময় নিজেও উচ্চমূল্যে কিনে আনেন। তিনি তার ভাড়া, শ্রম, নষ্টের ঝুঁকি যোগ করে দাম ঠিক করেন। ফলে বাজারের শেষ প্রান্তে শাস্তি দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

এই অদৃশ্য অর্থনীতি কেবল মূল্যবৃদ্ধির কারণ নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যও বাড়ায়। খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্য নিম্নআয়ের পরিবারকে পুষ্টিহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। খাদ্যব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সঞ্চয়ের মতো খাতে ব্যয় কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার কৃষক কম দাম পেলে উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে।

সমাধান তাই কেবল কঠোরতা নয়, কাঠামোগত সংস্কার। হাট-বাজারে ডিজিটাল রসিদ বাধ্যতামূলক করা গেলে নগদ অনিয়ন্ত্রিত লেনদেন কমবে। সড়কে বৈধ টোল একক ব্যবস্থায় আনলে অতিরিক্ত আদায়ের সুযোগ কমবে। পণ্যবাহী ট্রাকে জিপিএস ট্র্যাকিং ও অনলাইন মনিটরিং থাকলে অযাচিত থামানো বা হয়রানি কমানো সম্ভব। কৃষক সমবায় গড়ে তুলে সরাসরি শহুরে বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি করলে মধ্যস্বত্বভোগীর স্তর কমবে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংস্কার সম্ভব নয়। চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাজার কমিটি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নইলে অদৃশ্য টোলগেটগুলো অক্ষত থাকবে, আর বাজারে আগুন জ্বলতেই থাকবে।

মাঠের ৩৭ টাকার শসা যদি শহরে ৯০ টাকায় বিক্রি হয়, তবে এটি কেবল বাজারের স্বাভাবিক বিবর্তন নয়; এটি এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক শোষণ। কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে যে অগ্নিবলয় তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে না পারলে খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

সুতরাং এখন প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। কারণ সবজির দামে আগুন নিছক বাজারের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ববোধের আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই—একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা, নাকি অদৃশ্য চাঁদার বোঝায় নুয়ে পড়া অর্থনীতি—তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেইলী অবজারভার। 





LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close