সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়গুলো সাধারণত টেস্ট রিলিফ বা গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পের বরাদ্দ দিয়ে মাটির রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ করে থাকে।
তবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে গ্রামীণ স্থায়ী পাকা সড়ক নির্মাণ করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে অন্তত ১০০টি গ্রামীণ পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সুবিধাভোগীদের প্রশংসায় ভাসছে এই অফিস। মাটির পরিবর্তে পুরানো সড়কগুলোকে ৮ থেকে ১৩ ফুট প্রস্থ এবং ৫০০ থেকে ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যে সিসি ঢালাই করে গ্রামীণ যাতায়াতের জন্য আপাতত স্থায়ী ও টেকসই সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ১০০টি গ্রামীণ সিসি পাকা সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। ফলে সদর উপজেলার লাখো মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ হয়েছে তেমনই স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও দৃশ্যমান হয়েছে।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সদর উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে কাবিটা কর্মসূচির আওতায় এক কোটি ৪৯ লাখ ২৩ হাজার ৩৬৮ টাকা এবং টিআর প্রকল্পে এক কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার ৭৮০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বরাদ্দ থেকে ৯টি ইউনিয়নে মোট ১০০টি ছোট পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি কালভার্ট। মোট বরাদ্দের প্রায় ৬৫ শতাংশ গ্রামীণ পাকা সড়ক নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে। অবশিষ্ট বরাদ্দ মসজিদ ও মন্দির উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জানান, পূর্বে বিভিন্ন সময়ে গ্রামীণ সড়কে মাটির কাজ করা হলেও এবারও তারা মাটির কাজের জন্য প্রকল্প জমা দিতে চেয়েছিলেন। তবে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে সামান্য মাটির কাজ করে সড়কগুলো পাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী বিস্মিত হন। পরবর্তীতে ১০০টি সড়কের প্রকল্প গ্রহণ করে সিসি ঢালাইয়ের কাজ শুরু করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কগুলোও পাকা হয়ে যাবে।
এই সড়কগুলো স্থানীয় বাজার, সদর সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী লিংক রোড হিসেবে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মানুষ ব্যবহার করছেন।
সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল হাই বলেন, 'স্থানীয় সরকার আমাদের তুলনামূলক ভাবে অল্প বাজেট দেয়। অনেক সময় এই বাজেটে প্রভাবশালীদের নজর পড়ে, ফলে বরাদ্দ সঠিক ভাবে ব্যবহার হয় না। কিন্তু এবার অল্প বাজেট দিয়েও আমরা এলাকায় একাধিক পাকা সড়ক নির্মাণ করতে পেরেছি। বাজেট বাড়ানো হলে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর অযাচিত চাপ না থাকলে গ্রামীণ উন্নয়ন আরও সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।'
মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মঈনুল হক বলেন, 'আমার ইউনিয়ন বড় হলেও বরাদ্দ কম। তবুও এই অল্প বরাদ্দে এবার বেশ কয়েকটি পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এতে হাজারো মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছে এবং এর সুফল তারা দীর্ঘদিন ভোগ করতে পারবেন। ইউনিয়ন পরিষদকে স্বাধীনতা দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হলে বদলে যাবে গ্রাম বাংলার চিত্র।'
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু হাসনাত সরকার বলেন, 'সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে আমরা ১৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ বরাদ্দ গ্রামীণ পাকা সড়ক নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে। এতে লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা হবে স্থায়ী ও টেকসই। ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।'
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা জেরিন বলেন, 'সুনামগঞ্জ বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। প্রতি বছর মাটির রাস্তা নির্মাণ হলেও তা দ্রুত ধসে যায়। তাই এবারের বরাদ্দে আমরা স্থায়ী কাজের দিকে গুরুত্ব দিয়েছি। চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাটির কাজের পরিবর্তে পাকা সড়কের প্রকল্প দিতে অনুরোধ করা হয়েছিল, তারাও সহযোগিতা করেছেন। কাজের মান ঠিক রাখা ও কোনো ধরনের দুর্নীতি ঠেকাতে আমি কঠোর নজরদারি করেছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কাজ আরও দৃশ্যমান হবে এবং মানুষ প্রকৃত অর্থেই উপকৃত হবে।'
এসএইচ/এমএ