বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপির সমালোচনা করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয়করণের নজির আমরা দেখেছি। কিন্তু এখন তো আরও বেশি দেখছি। স্থানীয় সরকার বিভাগের সব নিয়মকে তোয়াক্কা না করে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ এমনকি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও প্রশাসক বসিয়ে দলীয়করণের নজির স্থাপন করা হয়েছে। এখন তো দেখছি বিএনপির স্লোগান পরিবর্তন করা উচিত। সবার আগে বাংলাদেশ নয়, সবার আগে বিএনপি—স্লোগান হওয়া উচিত।
তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়, একচ্ছত্র দলীয়করণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ সার্বিক জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে ১১ দলীয় স্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আগামী ২০ জুন খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে খুলনায় জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে এ প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়।
এতে গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বিতর্কের নিষ্পত্তি সংসদে চায় জামায়াত। তা না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের দাবি তুলে ধরতেই এ বিভাগীয় মহাসমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। এই মহাসমাবেশের পরে ঢাকায় ১১ দলের জরুরি বৈঠক থেকে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা রাজপথে নামতে চাই না। চাই সংসদেই সবকিছু সমাধান করতে। কিন্তু সরকার আমাদের বাধ্য করলে রাজপথই হবে চূড়ান্ত জায়গা। কারণ প্রেম তো একতরফা হয় না।
সীমান্তে পুশইন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এটি নিয়ে সংসদে একজন এমপি নোটিশ দিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে সেটি প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। এতেই প্রমাণ হয়, কোথা থেকে কী হচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের হাজারো শহীদের রক্ত ও ত্যাগ এবং রক্তক্ষয়ী স্মৃতির বিনিময়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষ একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা করেছিল। সেই রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩৩টি রাজনৈতিক দল দফায় দফায় বৈঠক করে ৮৪টি সাংবিধানিক, আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ে একমত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি করেছিল।
তিনি বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৫ কোটি মানুষ (৭০ শতাংশ ভোটার) কোনো নোট অব ডিসেন্ট বা দ্বিমত ছাড়াই এই জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একে গ্রহণ করেন। নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা এই সনদের পক্ষে সারা দেশে ক্যাম্পেইন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তারা ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়ে বলছেন যে, এই গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ নাকি বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী।
প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশের বর্তমান জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকার গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে। আধুনিক চিকিৎসার এই যুগে কেবল সরকারের নির্লিপ্ততা ও ভ্যাকসিনের অব্যবস্থাপনার কারণে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকটি শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকার শুধু অতীতের দোষ দিয়ে বেঁচে যেতে চায়।
সারাদেশে এবং বিশেষ করে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের আয়রন মার্কেটে প্রতিটি দোকান থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করায় গত এক সপ্তাহ ধরে ৭০টি দোকান বন্ধ রয়েছে। এছাড়া শিশু হত্যা, খণ্ডবিখণ্ড লাশ উদ্ধার, মসজিদের ভেতরে ঢুকে গুলি এবং ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো বর্বর ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২১ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুলনা সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো এখন আইনশৃঙ্খলার চেয়ে সংবিধান নিয়ে বেশি ব্যস্ত।
সমাবেশ বাস্তবায়নের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ আলমের পরিচালনায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মোবারক হোসাইন।
সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা এমরান হুসাইন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর মাস্টার শফিকুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির খুলনা মহানগর সংগঠক আহম্মদ হামিম রাহাত, রমজান শেখ, খালিদ সাইফুল্লাহ, নূরুল হক নূর, যুথি আক্তার ও রফিক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর সভাপতি মুফতি শরীফ সাঈদুর রহমান, হাফেজ মো. শহীদুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রেস ব্রিফিং শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার ও জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ নগরীর স্যার ইকবাল রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের লিফলেট বিতরণ করেন। পরে তারা সার্কিট হাউস মাঠে নির্মাণাধীন সমাবেশের মঞ্চ পরিদর্শন করেন।
এসএস/আরএন